রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাদিসে ইরশাদ করেন, ‘আল্লাহ তাআলার ৯৯টি গুণবাচক নাম রয়েছে; যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার এ গুণবাচক নামের জিকির করবে, সে জান্নাতে যাবে।’ তাছাড়া এ গুণবাচক নামগুলোর আলাদা আলাদা অনেক উপকার ও ফজিলত রয়েছে। আল্লাহ তাআলার একটি গুণবাচক নাম (اَلْكَبِيْرُ) ‘আল-কাবিরু’। (اَلْكَبِيْرُ) ‘আল-কাবিরু’র অর্থ হলো সবচেয়ে বড়, যার নিকটেও কেউ নেই; তিনি ব্যতীত সব কিছুই ছোট; আসমান-জমিনের মহিমা ও গর্ব শুধুমাত্র তারই।’ আল্লাহর কাছে তার গুণবাচক নামসমূহের মাধ্যমে প্রার্থনা ও যিকির করলে আল্লাহ খুশি হন। এ প্রসঙ্গে আল- কুরআনের সূরা আরাফের ১৮০ নং আয়াতে বলা হয়েছে, ‘আর আল্লাহর জন্য রয়েছে সব উত্তম নাম। কাজেই সে নাম ধরেই তাঁকে ডাক। আর তাদেরকে বর্জন কর, যারা তাঁর নামের ব্যাপারে বাঁকা পথে চলে। তারা নিজেদের কৃতকর্মের ফল শিগগিরই পাবে। ’ উত্তম নাম বলতে সে সকল নামকে বোঝানো হয়েছে, যা গুণ-বৈশিষ্ট্যের পরিপূর্ণতায় সর্বোচ্চ স্তরকে চিহ্নিত করে। তার গুণবাচক নামকে বলা হয়, আসমাউল হুসনা। উপরোক্ত আয়াতেও ‘আসমাউল হুসনা’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, যার দ্বারা বোঝা যায় যে, এসব আসমাউল হুসনা বা উত্তম নামসমূহ একমাত্র আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের বৈশিষ্ট্য। এ বৈশিষ্ট্য লাভ করা অন্য কারও পক্ষে সম্ভব নয়। আয়াতের মর্ম কথা হলো, হামদ, সানা, গুণ ও প্রশংসাকীর্তন, তাসবীহ-তাহলীলের যোগ্য যেহেতু শুধুমাত্র আল্লাহ-ই এবং বিপদাপদে মুক্তি দান আর প্রয়োজন মেটানোও শুধু তাঁর-ই ক্ষমতায়। কাজেই যদি প্রশংসা ও গুণকীর্তণ করতে হয়, তবে তাঁরই করবে আর নিজের প্রয়োজন বা উদ্দেশ্য সিদ্ধি কিংবা বিপদমুক্তির জন্য ডাকতে হলে শুধু তাঁকেই ডাকবে, তাঁরই কাছে সাহায্য চাইবে। আর ডাকার পদ্ধতিও বলে দেওয়া হয়েছে যে, তাঁর জন্য নির্ধারিত ‘আসমায়ে হুসনা’ বা উত্তম নামে -ই ডাকবে। এ আয়াতের মাধ্যমে গোটা মুসলিম জাতিকে দুটি হিদায়াত বা দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, প্রথমত : আল্লাহ ব্যতীত কোন সত্তাই প্রকৃত হামদ-সানা বা বিপদমুক্তি বা উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্য ডাকার যোগ্য নয়। দ্বিতীয়ত : তাঁকে ডাকার জন্য মানুষ এমন মুক্ত নয় যে, যেকোনো শব্দে ইচ্ছা ডাকতে থাকবে, বরং আল্লাহ বিশেষ অনুগ্রহপরবশ হয়ে আমাদিগকে সেসব শব্দ সমষ্টি শিখিয়ে দিয়েছেন যা তাঁর মহত্ব ও মর্যাদার উপযোগী। সেই সাথে এ সমস্ত শব্দেই তাঁকে ডাকার জন্য আমাদিগকে বাধ্য করে দিয়েছেন যাতে আমরা নিজের মত শব্দ পরিবর্তন না করি। কারণ, আল্লাহর গুণ বৈশিষ্ট্যের সব দিক লক্ষ্য রেখে তাঁর মহত্বের উপযোগী শব্দ চয়ন করতে পারা মানুষের সাধ্যের ঊর্ধ্বে। (মায়ারেফুল কুরআন  কুরআনে বর্ণিত আল্লাহর ৯৯টি গুণবাচক নাম :১. আল্লাহ : “বল, তিনিই আল্লাহ, এক-অদ্বিতীয়।” (সূরা আল-ইখলাস :০১),২. আর রহমানু : “পরম দয়ালু।” (সূরা আর-রহমান : ০১), ৩. আর রাহিমু : (সীমাহীন করুণাময়) “পরম করুণাময়, অতি দয়ালু।” (সূরা ফাতিহা : ০৩), এ ছাড়া কুরআনুল কারিমের বিভিন্ন সূরায় নিম্নে বর্ণিত গুণবাচক নামগুলো রয়েছে ৪. মালিকু (সত্তাধিকারী),৫. আল কুদ্দুসু (মহাপবিত্র),৬. আস্-সালামু (শান্তিদাতা),৭. আল-মুমিনু (নিরাপত্তাদাতা),৮. আল-মুহাইমিনু (রক্ষণাবেক্ষণকারী),৯. আল-আযিযু (মহাপরাক্রমশালী),১০. আল-জাব্বারু (মহাপ্রতাপশালী),১১. আল-মুতাকাব্বিরু (মহাগৌরবের অধিকারী),১২. আল-খালিকু (সৃষ্টিকর্তা),১৩. আল-কারিমু (উদ্ভাবনকারী),১৪. আল-মুসাব্বিরু (আকৃতিদানকারী),১৫. আল-গাফ্ফারু (অসীম ক্ষমাশীল),১৬. আল-কাহ্হারু (মহাপরাক্রমশালী),১৭. আল-ওয়াহ্হাবু (মহান দাতা),১৮. আল রাজ্জাকু (রিজিকদাতা),১৯. আল-ফাত্তাহু (মহা বিজয়দানকারী),২০. আল-আলিমু (মহাজ্ঞানী),২১. আল-ক্বাবিদু (হরণকারী),২২. আল-বাসিতু (সম্প্রসারণকারী),২৩. আল-খাফিদু (অবনতকারী),২৪. আর রাফিয়ু (উন্নতকারী),২৫. আল মুয়িযু (মর্যাদাদানকারী),২৬. আল-মুজিল্লু (অপমানকারী),২৭. আস-সামিয়ু (সর্বশ্রোতা),২৮. আল-বাসিরু (সর্বদ্রষ্টা)২৯. আল-হাব্বিসু (মহাবিচারক),৩০. আল-আদিলু (ন্যায়পরায়ণ),৩১. আল-লাতিফু (সূক্ষ্মদর্শী),৩২. আল-খাবিরু (মহা সংবাদরক্ষক),৩৩. আল-হালিমু (মহা সহিষ্ণু),৩৪. আল-আযিমু (মহান),৩৫. আল-গাফুরু (ক্ষমাশীল),৩৬. আশ্ শাকুরু (গুণগ্রাহী),৩৭. আল-আলিয়্যু (মহা উন্নত),৩৮. আল-কাবিরু (সর্বাপেক্ষা বড়),৩৯. আল-হাফিযু (মহারক্ষক),৪০. আল-মুকিতু (মহান শক্তিদাতা),৪১. আল-হাসিবু (হিসাব গ্রহণকারী),৪২. আল-জালিলু (মহা মহিমাময়)৪৩. আল-কারিমু (মহা অনুগ্রহশীল),৪৪. আর রাকিবু (মহাপর্যবেক্ষণকারী),৪৫. আল-মুজিবু (মহান কবুলকারী),৪৬. আল- ওয়াসিয়ু (মহাবিস্তারকারী),৪৭. আল-হাকিমু (মহাপ্রজ্ঞাময়),৪৮. আল-ওয়াদুদু (প্রেমময় বন্ধু),৪৯. আল-মাজিদু (মহাগৌরবান্বিত),৫০. আল-বাইসু (পুনরুত্থানকারী),৫১. আশ্শাহীদু (সর্বদর্শী),৫২. আল-হাক্কু (মহাসত্য), ৫৩. আল-ওয়াকিলু (মহান দায়িত্বশীল বা প্রতিনিধি), ৫৪. আল-ক্বাযিয়্যু (মহাশক্তি ধর), ৫৫. আল-মাতিনু (চূড়ান্ত সুরক্ষিত ক্ষমতার অধিকারী), ৫৬. আল-ওয়ালিয়্যু (মহান অভিভাবক), ৫৭. আল-হামিদু (মহাপ্রশংসিত), ৫৮. আল-মুহ্সিয়্যু (পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব গ্রহণকারী), ৫৯. আল-মুবদিয়ু (সূচনাকারী), ৬০. আল-মুঈদু (পুনঃসৃষ্টিকারী), ৬১. আল-হাইয়্যু (চিরঞ্জীব), ৬২. আল-কাইয়্যুমু (চিরস্থায়ী), ৬৩. আল-মুহ্য়িয়ু (জীবনদানকারী), ৬৪. আল-মুমিতু (মৃত্যুদানকারী), ৬৫. আল-ওয়াজিদু (ইচ্ছাপূরণকারী),m ৬৬. আল-মাজিদ (মহাগৌরবান্বিত), ৬৭. আল-ওয়াহিদু (একক সত্তা), ৬৮. আস্ ছামাদু (স্বয়ংসম্পূর্ণ/অমুখাপেক্ষী), ৬৯. আল-ক্বাদিরু (সর্বশক্তিমান), ৭০. আল-মুক্তাদিরু (মহান কুদরতের অধিকারী), ৭১. আল-মুকাদ্দিমু (অগ্রসরকারী), ৭২. আল-মুআখ্খিরু (বিলম্বকারী), ৭৩. আল-আউওয়ালু (অনাদি), ৭৪. আল-আখিরু (অনন্ত), 7৫. আয যাহিরু (প্রকাশ্য), ৭৬. আল-বাতিনু (লুক্কায়িত), ৭৭. আল-ওয়ালিউ (মহান অধিপতি), ৭৮. আল-মুতাআলিয়ু (চির-উন্নত), ৭৯. আল-বাররু (কল্যাণদাতা), ৮০. আত্ তাউওয়াবু (মহান তওবাকবুলকারী), ৮১. আল-মুন্তাকিমু (প্রতিশোধ গ্রহণকারী),৮২. আল-আফুউ (ক্ষমাকারী/উদারতা প্রদর্শনকারী), ৮৩. আর-রাউফু (অতিশয় দয়ালু), ৮৪. মালিকুল মুলকি (সর্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী), ৮৫. যুল-যালালি ওয়াল ইকরামি (গৌরব ও মহত্ত্বের অধিকারী), ৮৬. আল-মুকসিতু (ন্যায়পরায়ণ), ৮৭. আল-জামিয়ু (একত্রকারী), ৮৮. আল-গানিয়্যু (ঐশ্বর্যের অধিকারী), ৮৯. আল-মুগনিয়ু (ঐশ্বর্যদানকারী), ৯০. আল-মানিয়ু (প্রতিরোধকারী), ৯১. আদ্-দাররু (অনিষ্টকারী), ৯২. আন-নাফিয়ু (উপকারকারী), ৯৩. আন্ নূরু (জ্যোতি), ৯৪. আল-হাদিয়ু ( হেদায়েতকারী/পথ প্রদর্শনকারী), ৯৫. আল-বাদিয়ু (সূচনাকারী), ৯৬. আল-বাকিয়ু (চিরবিরাজমান), ৯৭. আল-ওয়ারিসু (স্বত্বাধিকারী), ৯৮. আর রাশিদু (সৎপথে পরিচালনাকারী), ৯৯. আস-সাবুরু (মহাধৈর্যশীল)। বিভিন্ন হাদীস অণুসারে, আল্লাহ’র ৯৯টি নামের একটি তালিকা আছে, কিন্তু তাদের মধ্যে কোনো সুনির্দিষ্ট ধারাবাহিক ক্রম নেই; তাই সম্মিলিত মতৈক্যের ভিত্তিতে কোনো সুনির্দিষ্ট তালিকাও নেই। তাছাড়া কূরআন এবং হাদিসের বর্ণনা অণুসারে আল্লাহ্’র সর্বমোট নামের সংখ্যা ৯৯-এর অধিক, প্রায় ৪,০০০। অধিকন্তু আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ কর্তৃক বর্ণিত একটা হাদিসে বর্ণিত হয়েছে যে, আল্লাহ্ তার কিছু নাম মানবজাতির অজ্ঞাত রেখেছেন।এই নামসমূহের ব্যাপারে ক্বুরআনের বর্ণনায় আল্লাহ তাআলার উদ্ধৃতি এসেছে“ আল্লাহ বলে আহ্বান কর কিংবা রহমান বলে, যে নামেই আহবান কর না কেন, সব সুন্দর নাম তাঁরই। — সূরা বনী-ইসরাঈল আয়াত ১১০। ”অনেকগুলো হাদিস দ্বারাই প্রমাণিত যে,[৩] মুহাম্মাদ (সাঃ) আল্লাহ’র অনেকগুলো নাম-এর উল্লেখ করেছেন।উদাহরণস্বরূপ, একটি বিশুদ্ধ হাদিসে হযরত আবু হোরায়রা (রাঃ) জনাব মুহাম্মাদ (সাঃ) এর উক্তি বর্ণনা করেন যে,“ حَدَّثَنَا عَمْرٌو النَّاقِدُ، وَزُهَيْرُ بْنُ حَرْبٍ، وَابْنُ أَبِي عُمَرَ، جَمِيعًا عَنْ سُفْيَانَ، – وَاللَّفْظُ لِعَمْرٍو – حَدَّثَنَا سُفْيَانُ بْنُ عُيَيْنَةَ، عَنْ أَبِي الزِّنَادِ، عَنِ الأَعْرَجِ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ ‏”‏ لِلَّهِ تِسْعَةٌ وَتِسْعُونَ اسْمًا مَنْ حَفِظَهَا دَخَلَ الْجَنَّةَ وَإِنَّ اللَّهَ وِتْرٌ يُحِبُّ الْوِتْرَ ‏”‏ ‏.‏ وَفِي رِوَايَةِ ابْنِ أَبِي عُمَرَ ‏”‏ مَنْ أَحْصَاهَا ‏”‏ ”
অর্থাৎ,“ আল্লাহ তাআলার ৯৯টি নাম আছে; সেগুলোকে মুখস্থকারী ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে। যেহেতু আল্লাহ তাআলা বিজোড় (অর্থাৎ, তিনি একক, এবং এক একটি বিজোড় সংখ্যা), তিনি বিজোড় সংখ্যাকে ভালোবাসেন। আর ইবনে উমরের বর্ণনায় এসেছে যে, (শব্দগুলো হলো) “যে ব্যক্তি সেগুলোকে পড়বে”।[৪] ” ক্বুরআনের বর্ণনায় আল্লাহ’র গুণবাচক নামসমূহকে “সুন্দরতম নামসমূহ” বলে উল্লেখ করা হয়েছে। (নিম্ন-বর্ণিত দেখুন সূরা আল আরাফ ৭:১৮০, বনী-ইসরাঈল 17:110, ত্বোয়া-হা 20:8, আল হাশ্‌র 59:24)