হঠাৎ ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে ২০ কিলোমিটার যানজট
মাওলানা সাদ কান্ধলভীকে ঠেকাতে গতকাল বিমানবন্দর একালায় বিক্ষোভ করেন হাজার হাজার আলেম-ওলামা। তাদের এই বিক্ষোভ ও অবস্থানে ঢাকা-ময়মনসিংহ রোডে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। হাজার হাজার গাড়ী ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। চরম দুর্ভোগে পড়েন হাজার হাজার যাত্রী। বিশেষ করে শিশু ও মহিলা যাত্রীরে পড়েন চমর দুর্দশায়। ৩ ঘণ্টা ধরে চলা বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে বিমানবন্দরের সামনের ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের দু’পাশে ২০কিলোমিটারব্যাপী যানজট তৈরি হয়। হঠাৎ করে গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা বন্ধ করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন যানবাহনের যাত্রীরা। বিদেশ থেকে যারা দেশে ফিরে আসেন তাদের দুর্ভোগ ছিল বর্ণনাতীত। নজীরবিহীন এমন ঘটনায় প্রবাসীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, নিজেদের কোন্দল রাস্তায় এনে জনগণকে নিদারুণ কষ্টে ফেলার অধিকার কারো নেই। বিক্ষোভকারীরা বলছেন, এবারের ইজতেমায় মাওলানা সাদের অংশ নিতে দেবেন না। এ বিষয়ে তারা আগে থেকেই বিরোধিতা করে আসছেন। সরজমিনে দেখা গেছে, রাজধানী বিমানবন্দর একালায় ময়মনসিংহগামী সড়কের হাজার হাজার আলেম ওলামারা বিক্ষোভ করছেন। দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং ব্যস্ততম এ সড়কে বিক্ষোভের ফলে যান চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। যানজট ঠেকেছে কুড়িল বিশ্বরোড থেকে আব্দুল্লাহপুর পাড় হয়ে টঙ্গী ব্রীজ পর্যন্ত। সড়কে উভয় পাশে যান চলাচল বন্ধ হওয়ায় চরম বিপাকে পড়েছেন হাজার হাজার যাত্রী। অনেকে উপায় না পেয়ে পায়ে হেঁটেই রওয়ানা দিয়েছেন। যাদের পক্ষ্যে হেটে গন্তব্যে পৌঁছা সম্ভভ নয় তারা ঘন্টার পর ঘন্টা বাসে বসেই যানজট মুক্ত হওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে। রোগী বহনের একাধিক অ্যাম্বুলেন্সকে ঘন্টার পর ঘন্টা যানজটে আটকে থাকতে দেখে পথচারীদের অনেকেই চোখের পানি ফেলেছেন। বিমানবন্দর থানার ওসি নূরে আযম বলেন, আপাতত মাওলানা সাদকে ইজতেমা মাঠে নেয়া হবে না।
উল্লেখ গত কয়েক বছরের ধারাবাহিকতায় এ বছর ১২ জানুয়ারি ও ১৯ জানুয়ারি দুই দফায় বিশ্ব ইজতেমা অনুষ্ঠিত হবে। প্রথম দফায় ১৪ জানুয়ারি ও দ্বিতীয় দফায় ২১ জানুয়ারি আখেরি মোনাজাত অনুষ্ঠিত হবে।
জানা যায়, দেওবন্দের সাথে বিভিন্ন বিষয়ে ভিন্নমত, কোরআন-হাদীসের অপব্যখ্যা ও তাবলীগের সিনিয়র মুরব্বীদের তত্ত¡াবধান না মানা দিল্লীর মাওলানা সা’দের বিরুদ্ধে ক্ষোভের মূল কারণ উল্লেখ করে বিক্ষোভকারীদের একজন বলেন, আল্লামা শফীসহ দেশের শীর্ষ কওমী আলেমদের নির্দেশনা না মেনে দিল্লীর মাওলানা সা’দ ঢাকায় এসেছেন শুনে আমরা রাস্তায় নেমে এসেছি। গতকাল দুপুর থেকেই হযরত শাহজালাল রহ. আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সম্মুখ ও তার আশপাশের এলাকা ছিল তাবলীগের একাংশ ও কওমী মাদরাসা শিক্ষার্থীদের দখলে। এসময় মহাখালী থেকে এয়ারপোর্ট পর্যন্ত ব্যাপক যানজটের সৃষ্টি হয়। একই অবস্থা ছিল এয়ারপোর্ট থেকে আব্দুল্লাহ পুর ও টঙ্গির বিভিন্ন রাস্তার। এবারকার ইজতেমায় দিল্লীর মাওলানা সা’দের আসা না আসা নিয়ে কয়েকমাস ধরেই চলছিল বিরোধ। সরকার আলেম উলামা ও তাবলীগের বিবাদমান দুটি গ্রæপকে নিয়ে একাধিকবার আলোচনায় বসলেও বিষয়টির সুরাহা হয়নি। এর আগে একাধিকবার ঢাকার তাবলীগের মারকাজ কাকরাইলে দিল্লীর মাওলানা সা’দ সমর্থক বনাম বিশ্ব তাবলীগের সিনিয়র অন্যান্য মুরব্বীর সমর্থক গ্রুপের মধ্যে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া, ভাংচুর, মারপিটসহ অস্ত্র নিয়ে ভীতিপ্রদর্শন ইত্যাদি সংঘটিত হয়। পুলিশি হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আসলেও বিরোধ মিমাংসা হয়নি। একপর্যায়ে সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা কাকরাইলের উভয় গ্রুপকে দেশের শীর্ষ ৫ আলেমের সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়ার পরামর্শ দেন। আলেমরা বলেছিলেন, বিবাদমান দুই গ্রুপের মুরব্বীদেরই ইজতেমায় আসতে হবে। এক পক্ষ না এলে অপর পক্ষও আসবেনা। এরআগে বিরোধ মিটানোর জন্য কাকরাইলের দু’গ্রæপের দুইজনসহ দেশের দুই আলেম প্রতিনিধি দিল্লী ঘুরে আসেন। কিন্তু আশানুরূপ ফল পাওয়া যায়নি। মাওলানা সা’দ দেওবন্দের সাথে সুসম্পর্ক তৈরী ও তার প্রতি আনা বিভিন্ন অভিযোগের কোনো সুরাহা দিতে পারেননি। সবশেষে আলেমরা সিদ্ধান্ত দেন দু’গ্রæপের কেউই দিল্লী থেকে ইজতেমায় আসতে পারবেননা, আসবেন তাদের প্রতিনিধি। এ সিদ্ধান্ত সরকার ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়কে আলেমরা জানিয়ে দেন। এসময় কাকরাইলের একটি পক্ষ মাওলানা সা’দকে আনার জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়কে চিঠি দেয়। এ খবর জেনে আলেম সমাজে চরম ক্ষোভ দেখা দেয়। তারা গতকাল বেফাক কার্যালয়ের (কাজলা ভাঙ্গাপ্রেস) সামনে বিক্ষোভ সমাবেশ করেন। এছাড়াও বিমানবন্দরসহ রাজধানীর একাধিক পয়েন্টে সা’দ বিরোধি তাবলীগি গ্রুপ ও আলেমদের বিক্ষোভ মিছিল, সমাবেশ ইত্যাদি অনুষ্ঠিত হয়। এতে নগরবাসী চরম দুর্ভোগের শিকার হন। ঢাকাজুড়ে অনেক পয়েন্টে আলেম ও শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করায় রাজধানী একপ্রকার অচল হয়ে পড়ে। সহনশীলতার প্রতীক তাবলীগ জামাত ও শান্তিপ্রিয় কওমী আলেম সমাজ তাদের ঘরোয়া বিষয়ে এমন গণবিক্ষোভ ও নাগরিক হয়রানি করতে পারেন বলে অনেকেরই বিশ্বাস হয়নি। তবে সারাদিনব্যাপী ভোগান্তি ছিল খুবই দুঃসহ।
তেজগাঁও থেকে মহাখালী পর্যন্ত আড়াই ঘন্টা জ্যামে পড়ে থাকা যাত্রী মহসিন বলেন, কোনো পূর্ব ঘোষনা ছাড়া একটি ধর্মীয় বিষয় নিয়ে যেভাবে দূর্ভোগ সৃষ্টি করা হলো জনমনে এর বিরূপ প্রভাব দীর্ঘদিন থাকবে। রাজনীতির প্রতি মানুষ বিরক্ত হয়ে ধর্মীয় ক্ষেত্রে শান্তি খোঁজার চেষ্টা করছিল। বিশেষ করে তাবলীগ জামাত ও ইজতেমা ছিল মুসলমানদের স্বস্তির ঠিকানা। এক্ষেত্রে বিরোধ ও দ্বন্দ খুবই দুর্ভাগ্যজনক। এ বিষয়ে বিশিষ্ট আলেম ও কাকরাইলের কিছু মুরব্বীর সাথে কথা বলে জানা গেছে তাবলীগ জামাত ধ্বংসের ষড়যন্ত্র চলছে। বিশ্ব ইজতেমা বাংলাদেশ থেকে অন্যদেশে সরিয়ে নেওয়া হতে পারে। নাস্তিক্যবাদী শক্তি বাংলাদেশে দ্বীনি কাজ বন্ধ করে দিতে চায়। আলেম সমাজ ও তাবলীগ জামাতের দ্বন্দ লাগাতে চায়। কাকরাইলের শুরার আলেম উপদেষ্টা কমিটির সদস্য মাওলানা মাহমুদুল হাসান বলেন, আলেমদের পরামর্শ কাকরাইলওয়ালারা মেনে নিলেই ভালো হতো। উল্লেখ্য গতকাল মাওলানা সা’দ ব্যংকক থেকে ট্যুরিষ্ট ভিসায় ঢাকা আসেন। এয়ারপোর্ট থেকেই তাকে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবী উঠে। তার সমর্থকরা প্রশাসনের সাথে যোগাযোগ করে অনুরোধ জানায় যেন সরকার আলেমদের সাথে পরামর্শ করে যে কোনো শর্তে তাকে ইজতেমার সময় তাকে ঢাকায় থাকতে দেয়। গত সন্ধ্যায় এ রিপোর্ট লেখার সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাসভবনে আলেমদের বৈঠকের প্রস্তুতি চলছিল। মন্ত্রণলায়ের একটি সূত্র জানায়, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল উষ্মা প্রকাশ করে বলেছেন, কাকরাইলের দু’য়েকজন লোকের ব্যবহারে আমি বিরক্ত। তারা তিনদিন আগে আমার কাছে মাওলানা সা’দের ভিসার আবেদনসহ দরখাস্ত জমা দেন, অথচ দেড়মাস আগেই অন্য সোর্স থেকে তার ভিসা নেওয়া হয়েছে। জানা যায়, জর্দান ও কলকাতা থেকে রিজেক্ট হওয়ার পর তিনি কৌশলে থাইল্যান্ড থেকে চলে আসেন। এদিকে আলেমরা এয়ারপোর্ট থেকে বের হওয়া প্রতিটি গাড়ি চেক করে দেখেন মাওলানা সা’দ এতে আছেন কি না। আল্লামা শফীর প্রতিনিধি মাওলানা আশরাফ আলী ও বেফাকের নেতৃবৃন্দ বলেন, সরকার যদি সা’দ সাহেবকে দ্রুত ফেরত না পাঠায়, তাকে কাকরাইলে থাকতে দেয় বা ইজতেমায় যে কোনো শর্তে শরিক হতে দেয় তাহলে সরকারের অপরিসীম ক্ষতি হবে। কিছু লোককে খুশি করার বিনিময়ে লাখো সা’দ বিরোধী তাবলীগি ও আলেম উলামাকে হারাবে তারা। আলেমদের একটি গ্রুপ ইজতেমার মঞ্চ দখলের জন্য টঙ্গির পথে রওয়ানা হন বলেও একটি সূত্র জানায়। সা’দ সমর্থক কাকরাইলের এক মুরব্বী জানান, একটি ছোট্ট বিষয়কে কেন্দ্র করে কিছু স্বার্থান্বেষী ও আন্তর্জাতিক ইসলাম বিরোধী চক্রের ক্রিড়নক শক্তি ঢাকার পরিবেশ নষ্ট করছে। সরল মনা আলেমদের ভুল বুঝিয়ে ঘরোয়া বিষয়কে ময়দানে টেনে আনছে। কোনো পক্ষ নেননি এমন একজন তাবলীগ সমর্থক আলেম হাফেজ আজিমুদ্দীন বলেন, বিশ্ব তাবলীগের জন্য এ খুবই ক্ষতিকর। আলেম সমাজের ইমেজের জন্য মারাত্মক হুমকি। ধর্মীয় শক্তিকে বিভক্ত করে বাংলাদেশে দ্বীনি ভবিষ্যতকে বিনাশ করে দেওয়ার এ ষড়যন্ত্র খুব বুদ্ধিমত্তার সাথে মোকাবেলা করতে হবে। আমরা নির্মোহ আলেম সমাজ ও দরদী তাবলীগ সমর্থকদের দিকে চেয়ে আছি। কোনো কিছুই যেন আমাদের দ্বীনি কাজ ও ঐক্যকে ধ্বংস করতে না পারে।