মুসলিম উম্মাহর শান্তি ও কল্যাণ কামনা

মো. দেলোয়ার হোসেন, মো. হেদায়েত উল্লাহ, টঙ্গী থেকে : বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর হেফাজত, হেদায়েত ও কল্যাণ কামনায় আখেরি মোনাজাতে অশ্রুসিক্ত নয়নে ও আমিন আমিন ধ্বনিতে শেষ হলো ৫৩তম বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্ব। গতকাল রোববার বেলা ১০টা ৪০ মিনিট থেকে শুরু হয়ে ১১টা ১৫ মিনিট পর্যন্ত ৩৫ মিনিটব্যাপী আখেরি মোনাজাত এবারই প্রথম বাংলায় পরিচালনা করেন বিশ্ব তাবলিগ জামাতের অন্যতম সূরা সদস্য বাংলাদেশের কাকরাইল জামে মসজিদের খতিব হাফেজ মাওলানা মোহাম্মদ যোবায়ের। গতকাল আখেরি মোনাজাতে লাখো ধর্মপ্রাণ মুসল্লি নিজ নিজ গুনাহ মাফ, সারা দুনিয়ার কল্যাণ কামনা, আল্লাহর নৈকট্য লাভ, দুনিয়াতে হানাহানি, মারামারিমুক্ত শান্তিময় সমাজ কামনা এবং ইহ ও পারলৌকিক সুখ-শান্তি কামনা করে আল্লাহর দরবারে দু’হাত তুলে আমিন আমিন ধ্বনিতে কান্নায় ভেঙে পড়েন। এবার বাংলায় মোনাজাত করায় বাংলা ভাষাভাষী দেশি-বিদেশি মুসল্লিগণ মোনাজাতের মর্ম উপলব্ধি করতে পারেন এবং নিজ নিজ গুনাহর কথা স্মরণ করে তারা মহান পরওয়ারদেগার আল্লাহর দরবারে কান্নায় ভেঙে পড়েন। এ সময় দেশ-বিদেশের লাখ লাখ ধর্মপ্রাণ মুসলমান মহান সৃষ্টিকর্তার প্রতি আনুগত্যের এক অনুপম দৃষ্টান্ত স্থাপনের মধ্য দিয়ে আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ জানান। বিশ্ব ইজতেমার প্রথম ধাপের আখেরি মোনাজাতে বঙ্গভবন থেকে প্রেসিডেন্ট অ্যাডভোকেট আবদুল হামিদ, গণভবন থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, গুলশান থেকে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া, ইজতেমা ময়দানে মূলমঞ্চে বসে আখেরি মোনাজাতে শরিক হন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী অ্যাডভোকেট আ ক ম মোজাম্মেল হক, স্থানীয় সংসদ সদস্য জাহিদ আহসান রাসেল, গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট আজমত উল্লা খানসহ বিভিন্ন মুসলিম দেশের ক‚টনীতিক, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা ও পদস্থ সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তাগণ অংশ নেন। আখেরি মোনাজাতের আগে ভোর থেকে হেদায়েতি বয়ান করেন তাবলিগ জামাতের মুরুব্বিগণ। মুরুব্বিগণ নবী করিম (সা:)-এর তরিকা মনে করিয়ে দিয়ে গোনাহগার বান্দাদের দোয়া কবুল, আল্লাহর রাস্তায় জানমাল কোরবানি দেয়ার তৌফিক কামনা, মুসলমানদের জানমাল ও দেশের হেফাজত, ইমানি জিন্দেগি, আল্লাহ ও তার হাবিব রাসূল (সা:)-এর সুন্নতের পথে চলা এবং দাওয়াতি কাজের কৌশল সম্পর্কে হেদায়েতি বয়ান করেন। আখেরি মোনাজাতে মুসল্লিদের ঢল বিশ্ব ইজতেমার প্রথম দফায় তিন দিনব্যাপী বৃহত্তম এ জমায়েতের শেষ দিনে গতকাল রোববার ভোর থেকেই আখেরি মোনাজাতে শামিল হতে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ইজতেমা ময়দানে আসতে থাকেন। ট্রেন, বাস, ট্রাক, মাইক্রোবাস, জিপ, কার এবং নৌযানসহ বিভিন্ন যানবাহনে করে শীত ও কুয়াশা ভেঙে ইজতেমা ময়দানে পৌঁছান ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা। তবে এবার অন্যান্য বারের চেয়ে মুসল্লির উপস্থিতি কিছুটা কম হয়েছে। শনিবার মধ্য রাত থেকে আখেরি মোনাজাতের পূর্ব পর্যন্ত রাজধানীর খিলক্ষেতস্থ বিশ্বরোড থেকে যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেয়ায় যানবাহনের অভাবে মুসল্লিরা সকাল থেকেই দীর্ঘপথ পায়ে হেঁটে ইজতেমা অভিমুখে স্রোতের মতো আসতে থাকেন। কহর দরিয়া খ্যাত তুরাগ তীরের প্রায় ১৬৫ একর ময়দানে স্বেচ্ছাশ্রমে লাখো মুসল্লির জন্য বসা, বয়ান শোনা এবং থাকার সু-ব্যবস্থা করা হয়। সুষ্ঠুভাবে বিশ্ব ইজতেমার অনুষ্ঠান নিশ্চিত করতে বিপুল সংখ্যক র‌্যাব, পুলিশ এবং অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন করা হয়। গত ১২ জানুয়ারি শুক্রবার শুরু হয় এবারের ইজতেমার প্রথম পর্ব। ঢাকাসহ ১৬ জেলার মুসল্লিদের পাশাপাশি বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশের প্রায় ১২ সহস্রাধিক বিদেশি মুসল্লিসহ প্রায় ২০ লাখ ধর্মপ্রাণ মুসল্লি ইজতেমার আখেরি মোনাজাতে অংশ নেন। আখেরি মোনাজাতে অংশ নিতে বিভিন্ন এলাকা থেকে কয়েক হাজার মহিলা মুসল্লি­ও আগের দিন রাত থেকে ইজতেমা ময়দানের আশেপাশে, বিভিন্ন মিলকারখানা, বাসা-বাড়িতে ও বিভিন্ন দালানের ছাদে বসে আখেরি মোনাজাতে অংশ নিতে দেখা যায়। ইজতেমায় মহিলাদের জন্য আলাদা কোনো ব্যবস্থা না থাকায় যে যেখানে পেরেছেন, সেখানে বসেই লাখো মুসল্লির সাথে মোনাজাতে অংশ নিয়েছেন। ফিরতি পথে চরম দুর্ভোগ মোনাজাত শেষে লাখো মুসল্লি তাদের নিজ নিজ গন্তব্যে যেতে যানবাহন সঙ্কটে পড়ে চরম দুর্ভোগের শিকার হন। মোনাজাত শেষে লাখ লাখ মুসল্লি ইজতেমা ময়দান থেকে বিভিন্ন গন্তব্যে স্রোতের মতো একসাথে ফিরতে শুরু করলে একপর্যায়ে ময়দানের চারদিকে ছয়-সাত কিলোমিটার বিস্তীর্ণ এলাকায় মানব জটের সৃষ্টি হয়। এদিকে ভোর থেকে টঙ্গী থেকে চৌরাস্তা পর্যন্ত ছয় কিলোমিটার ও টঙ্গী থেকে পূবাইল পর্যন্ত পাঁচ কিলোমিটার, টঙ্গী-আব্দুল্লাহপুর থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত ছয় কিলোমিটার, টঙ্গী থেকে আশুলিয়া সড়কের চার-পাঁচ কিলোমিটার পর্যন্ত ইজতেমামুখী সকল যানবাহন চলাচল মুসল্লিদের মোনাজাত শেষে বাড়ি ফেরার জন্য বন্ধ রাখা হয়। এতে মুসল্লিরা পায়ে হেঁটেই ওই সকল দূরত্বের পথ পাড়ি দিয়ে মোনাজাত শেষে যে যার গন্তব্যে রওয়ানা দেন। ৫৩তম বিশ্ব ইজতেমা শেষে দেশ-বিদেশে যাওয়ার জন্য চিল্লাধারী মুসল্লিগণকে তাশকিল কামরায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং তারা সেখানেই দ্বিতীয় পর্ব শেষ না হওয়া পর্যন্ত অবস্থান করবেন। মোনাজাত শেষে ফেরার পথে নিরূপায় হয়ে মুসল্লিরা স্থানীয় ট্রাক টার্মিনাল থেকে ট্রাক ভাড়া নিয়ে গাদাগাদি করে যার যার গন্তব্যে ফিরতে দেখা যায়। নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবারের বিশ্ব ইজতেমায় নজীরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে প্রশাসনের পক্ষ থেকে। আট স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় সাত হাজারের অধিক পুলিশ ও র‌্যাবের পাশাপাশি দায়িত্বরত রয়েছে সাদা পোশাকে গোয়েন্দা পুলিশ। বিভিন্ন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে আকাশে র‌্যাবের হেলিকপ্টার টহল, নৌপথে স্পিড বোটে সতর্ক টহল ও নজরদারি। আকাশ ও নৌপথের পাশাপাশি সড়ক পথগুলোতে খালি চোখ ছাড়াও ওয়াচ টাওয়ারের মাধ্যমে বাইনোকুলার দিয়ে মুসল্লিসহ সকলের চলার পথ ও কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। এসব কার্যক্রম অস্থায়ীভাবে স্থাপিত র‌্যাবের প্রধান নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে মনিটরিং করা হয়েছে। গাজীপুর জেলা পুলিশ সুপার হারুন-অর রশিদ জানান, বিশ্ব ইজতেমা উপলক্ষে এ নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকবে আগামী দ্বিতীয় পর্বের ইজতেমা পর্যন্ত।
ইজতেমায় আরো তিন মুসল্লির মৃত্যু ইজতেমায় প্রথম পর্বে অংশ নেয়া তিন মুসল্লির মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে প্রথম পর্বে ছয়জন মুসল্লির মৃত্যু হলো। শনিবার রাতে অসুস্থ হয়ে চুয়াডাঙ্গা সদরের বাদুতলা এলাকার আব্দুল মাবুদ জোয়ারদার (৫২), জামালপুরের সরিষাবাড়ী থানার চরআদরা এলাকার আব্দুল কাদের (৬০) ও কুমিল্লার মনোহরগঞ্জ থানার নাথেরপেটুয়া এলাকার নূরুল আলম ওরফে নূর হোসেন (৭০) মারা যান। এর আগে গত শুক্রবার রাতে এক মালয়েশীয়সহ তিন মুসল্লির মৃত্যু হয়।আগামী বছর বিশ্ব ইজতেমা বিশ্ব ইজতেমার মুরব্বি ইঞ্জিনিয়ার মো. গিয়াস উদ্দিন জানান, আগামী বছর অর্থাৎ ২০১৯ সালের বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্ব শুরু হবে ১১ জানুয়ারি। ১৩ জানুয়ারি আখেরি মোনাজাত এবং দ্বিতীয় পর্ব অনুষ্ঠিত হবে ১৮ জানুয়ারি এবং শেষ হবে ২০ জানুয়ারি। গত শুক্রবার রাতে কাকরাইল মসজিদে তাবলিগ সূরার মুরুব্বিদের এক পরামর্শসভায় ওই তারিখ নির্ধারণ করা হয়

 

2018-01-15T09:49:03+00:00January 15th, 2018|বাংলাদেশ|
Advertisment ad adsense adlogger