আমার সাহস ও কাজ বিএনপির কাছে বড় সমস্যা

প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনা বলেছেন, বিএনপির কাছে আমিই যেন বড় সমস্যা। দেশের জনগণ আমাকে সমর্থন করে, ভয়-ভীতি আমার নেই। অনেক ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে আমি সাহস নিয়ে দেশের কল্যাণের জন্য কাজ করে যাচ্ছি। এজন্যই আমাকে হত্যার জন্য বুলেট-গুলি, গ্রেনেড হামলা, বড় বড় বোমা পুঁতে রাখা হয়। তবুও আমি মরি না। আল্লাহ আমাকে কীভাবে যেন বাঁচিয়ে রাখেন। হয়ত দেশের মানুষের জন্য কোন ভাল করাবেন। আর মৃত্যুকে আমি ভয় পাই না। জন্মিলে মৃত্যু হবেই। তা নিয়ে আমি চিন্তা করি না। আর কে কত বিশেষণে আমাকে ভূষিত করল বা কী পেলাম আর কী পেলাম না- সেই হিসাব আমি মেলাই না। যে যতই বিশেষণে বিশেষায়িত করুক, আমার মাথা খারাপ হয় না, এসব আমাকে প্রভাবিত করে না। বরং দেশের জন্য কী করতে পারলাম, দেশের মানুষকে কতটুকু শান্তি, স্বস্তি ও উন্নতি দিতে পারলাম, সেটাই আমার কাছে সবচেয়ে বড় কথা। স্পীকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে বুধবার জাতীয় সংসদ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর পর্বে জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য ফখরুল ইমাম ‘বিএনপি নেতারাই বলেন- শেখ হাসিনা থাকলে তাদের ক্ষমতায় যাওয়া সম্ভব নয়’-এমন সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। তিনি আরও বলেন, নির্বাচন এলেই দেশের একটি শ্রেণী আছে তারা মাথা চাড়া দিয়ে উঠে। এই শ্রেণীর মানুষের কাছে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ভাল লাগে না। দেশের কোন উন্নয়নই তারা চোখে দেখে না। সারাবিশ্ব বাংলাদেশকে উন্নয়নের রোলমডেল বললেও তা তাদের কাছে যান না। আসলে তারা চোখ থাকতেও অন্ধ, কান থাকতেও বধির। দেশে অসাংবিধানিক শাসন বা জরুরী অবস্থা আসলে তাদের গুরুত্ব বাড়ে। প্রধানমন্ত্রী সুশীল সমাজের কিছু মানুষের কর্মকা-ের কড়া সমালোচনা করে আরও বলেন, এদের মাথায় একটাই জিনিস থাকে যদি অস্বাভাবিক, অসাংবিধানিক, মার্শাল ল’ বা জরুরী অবস্থা কখন আসবে, তাদের গুরুত্ব পাবে। এই শ্রেণীর মানুষরা আঁকাবাঁকা বা অবৈধপথে ক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্ন দেখে। কারণ নির্বাচিত হয়ে তো তারা মন্ত্রী হতে পারবে না, পতাকা উড়াতে পারবে না। সেজন্য তো তাদের জনগণের কাছে যেতে হবে। তাদের নির্বাচনে আসার সাহস নেই, নির্বাচনে গেলে জনগণের ভোট পাবে না। তাই আঁকা-বাঁকা গলিপথে ক্ষমতায় যাওয়ার পথ খোঁজেন। তিনি বলেন, ওয়ান ইলেভেনের সময়ও তারা ক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্ন দেখেছিল। আর ২০১৩ সালেও বিএনপি নেত্রী (খালেদা জিয়া) নির্বাচন বানচাল করে আঁকা-বাঁকা পথে ক্ষমতায় যেতে চেয়েছিলেন। জনগণ প্রতিহত করায় তারা বিছানায় শুয়ে পড়ে বলে, আর বোধহয় হলো না। দেশে নির্বাচন এলেই এই শ্রেণীর লোকরা মাথা চাড়া দিয়ে উঠেন। অবৈধভাবে ক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্ন দেখেন। এই শ্রেণীর মানুষরা দেশ ও দেশের মানুষের জন্য যন্ত্রণাদায়ক। হাজারো বিশেষণও আমাকে প্রভাবিত করে না ॥ জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য ফখরুল ইসলাম সম্পূরক প্রশ্ন করতে গিয়ে বলেন- সারাবিশ্বের বিভিন্ন গণমাধ্যম ও রাষ্ট্র নেতাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘বিশ্ব মানবতার চ্যাম্পিয়ন, প্রাচ্যের নতুন তারকা, বিশ্ব মানবতার বিবেক, বিশ্ব মানবতার মা, বিশ্ব মানবতার আলোকবর্তিক’ ইত্যাদি নানা বিশেষণে তাঁকে ভূষিত করে সম্মানিত করেছেন। এতে বাঙালী হিসেবে আমরাও গর্বিত। সারাবিশ্ব যখন প্রধানমন্ত্রীর প্রশংসায় পঞ্চমুখ তখন রামপাল বিদ্যুত কেন্দ্রের কী প্রয়োজন আছে? জবাব দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এত আলো জ্বালিয়ে হঠাৎ করেই কেন প্রশ্নকর্তা সুইচ অফ করে দিলেন? বিদ্যুত কেন্দ্র প্রয়োজন দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য। ওই এলাকার মানুষকে জিজ্ঞেস করুন তারা বিদ্যুত চায় কি না। বিভিন্ন বিশেষণ সম্পর্কে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, কী পেলাম বা কী পেলাম না তার হিসাব আমি করি না। কাজ করি দেশের মানুষের জন্য, এদেশের প্রয়োজনে। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে স্বাধীনতার পরবর্তী ৫ বছরের মধ্যেই বাংলাদেশ অনেক উন্নত অবস্থায় যেত, দেশের মানুষকে কেউ অবহেলার চোখে দেখতে পারত না। বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে বহু বছর আগেই সারাবিশ্বে বাংলাদেশ উন্নয়নের দৃষ্টান্ত হতো। কিন্তু চক্রান্তকারীরা বঙ্গবন্ধুকে সেই সময়টুকু দেয়নি। প্রধানমন্ত্রী প্রশ্ন রেখে বলেন, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর দীর্ঘ ২১ বছর কেন দেশের উন্নয়ন হয়নি? একমাত্র আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পরই দেশের মানুষ উন্নয়নের ছোঁয়া পায়। আর কে কি বিশেষণ দিল তা আমাকে প্রভাবিত করে না। বরং দেশের মানুষ ভাল আছে কি না, খেতে পারছে কি না, ছেলে-মেয়েরা শিক্ষা পাচ্ছে কি না- সেটাই আমার কাছে বড় কথা। আমি উচ্চবিত্তদের কথা চিন্তা করি না, দেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন এবং তারা দু’বেলা পেটভরে খেয়ে স্বস্তি, শান্তি ও মর্যাদা নিয়ে মাথা উঁচু করে চলছে কি না, সেটিই আমার কাছে সবচেয়ে বড়কথা এবং আমার প্রধান লক্ষ্য। দেশের মানুষের জন্য কতটুকু করতে পারলাম, কী দিতে পারলাম, দেশ ও জাতির উন্নয়ন ও কল্যাণ করাই আমার ব্রত। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তকরণ পরবর্তী বাজেটে সিদ্ধান্ত ॥ তরিকত ফেডারেশনের সভাপতি সৈয়দ নজিবুল বশর মাইজভান্ডারীর সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ ও এমপিওভুক্তকরণের বিষয়টি সরকারের বিবেচনায় রয়েছে। আমরা নীতিমালার ভিত্তিতেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করে যাচ্ছি। বিষয়টি আমরা নিশ্চয়ই বিবেচনা করব এবং পরবর্তী বাজেট যখন আসবে তখন সিদ্ধান্ত নিতে পারব। স্কুল-কলেজ সরকারীকরণ বা এমপিওভুক্ত নীতিমালার ভিত্তিতেই হবে। কোন স্কুলে ছাত্রছাত্রী কত, শিক্ষার মান কেমন, শিক্ষকদেরও যোগ্যতা কেমন এবং স্কুলটি জাতীয়করণের যোগ্য কি না তা দেখতে হবে। দেশে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয়েছে ॥ জাসদ দলীয় সংসদ সদস্য নাজমুল হক প্রধানের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও জনগণকে ন্যায় বিচার দেয়ার লক্ষ্যে বিশেষ ভূমিকা রাখছে। ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যার পর খুনী মোশতাক ও জিয়ারা খুনীদের বিচার বন্ধ করে পুরস্কৃত করে। আত্মস্বীকৃত খুনীদের রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করার অপচেষ্টা করা হয়।
তিনি বলেন, ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করার পর ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল করে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিচারের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। কোন বিশেষ আইনে অথবা কোন বিশেষ আদালতে খুনীদের বিচার হয়নি। বিচার প্রক্রিয়া এবং আপীল শুনানি শেষে হত্যাকারীদের সাজা ইতোমধ্যে কার্যকর করা হয়েছে। এখনও যেসব খুনী বিভিন্ন দেশে পালিয়ে বা আশ্রয় গ্রহণ করে আছে তাদের দেশে ফিরিয়ে আনার সকল প্রকার প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে। শিক্ষার্থীদের মাঝে ২৬০ কোটি বই বিনামূল্যে বিতরণ ॥ সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য বেগম আখতার জাহানের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটি জ্ঞানভিত্তিক উৎপাদনশীল সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রয়াসের ধারাবাহিকতায় দেশের ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সবার জন্য মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি এবং শিক্ষার্থী ঝরে পড়া রোধ করার জন্য আওয়ামী লীগ সরকার বিগত মেয়াদে ২০০৯ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে ২০১০-১৩ শিক্ষাবর্ষ পর্যন্ত প্রথম থেকে ৯ম শ্রেণীর ছাত্রছাত্রীর মধ্যে বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ করেছে। ২০২১ সালের মধ্যে ২৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুত ॥ জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য ফখরুল ইমামের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী ২০৪১ সাল পর্যন্ত বিদ্যুত উৎপাদনের মহাপরিকল্পনার কথা ঘোষণা করে বলেন, বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতা গ্রহণের দুই মেয়াদে বিদ্যুত খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার খাত হিসেবে গ্রহণ করেছে। বর্তমান সরকার ২০২১ সালের মধ্যে ২৪ হাজার মেগাওয়াট এবং ২০৪১ সালের মধ্যে ৬০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুত উৎপাদনের জন্য মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে। দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে ॥ সরকারদলীয় সংসদ সদস্য সামশুল হক চৌধুরীর প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার ২০০৯ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পর দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৩ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বিদেশী বিনিয়োগ কিছুটা স্তিমিত হওয়া ব্যতিরেকে দেশে ক্রমবর্ধমান হারে বিদেশী বিনিয়োগ বাড়ছে। ২০০৯ সালে বিদেশী বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ৭শ’ মিলিয়ন ডলার, যা ২০১৬ সালে ২ হাজার ৩৩২ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে দাঁড়িয়েছে। মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা প্রায় ৩৫ গুণ বৃদ্ধি ॥ সরকারদলীয় সংসদ সদস্য বজলুল হক হারুনের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী জানান, ২০০৩-০৪ সালে একজন মুক্তিযোদ্ধা ভাতা যেখানে ছিল মাত্র ৩শ’ টাকা, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে তা বৃদ্ধি করে দুই লাখ মুক্তিযোদ্ধাকে ১০ হাজার টাকা করে ভাতা দেয়া হচ্ছে।

 

2018-01-18T09:50:47+00:00January 18th, 2018|বাংলাদেশ|
Advertisment ad adsense adlogger