পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমির মালিকানা স্থানীয়দের কাছেই থাকবে বলে আশ্বস্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জমি-জমার মালিকানা নিয়ে ঔপনিবেশিক আইন সংশোধন করে নতুন আইনের উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমাদের সব জায়গার মানুষ যেন তাদের ভূমির মালিকানাটা পায়। পার্বত্য অঞ্চলের মানুষ যেন তার ভূমির মালিকানটা সেইভাবে নিতে পারে আমরা সেই ব্যবস্থাই করতে চাই। কাজেই ওই মালিকানা তাদের নিজস্ব থাকবে এবং সেটাই আমরা নিশ্চিত করতে চাই।’ প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘যে শান্তিচুক্তি আমরা করেছি তার সিংগভাগ বাস্তবায়ন করেছি। যেটুকু বাকি আছে সেটা আমরা করব। ভূমি কমিশন আমরা গঠন করে দিয়েছি। ভূমি কমিশন যাতে নিয়মিত বসতে পারে সেই সমস্যাটারও সমাধান হতে পারে।’ পার্বত্য চট্টগ্রামে (সিএইচটি) বসবাসকারী মানুষের জন্য মৌলিক সামাজিক সেবা প্রাপ্তির সুযোগ সম্প্রসারণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজ আনুষ্ঠানিকভাবে চার হাজারতম পাড়াকেন্দ্র উদ্বোধন করায় সংঘাত-পরবর্তী এই এলাকার মানুষের জন্য উন্নয়ন সম্ভাবনার একটি নতুন দ্বার উন্মুক্ত হয়েছে। যৌথভাবে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড ও ইউনিসেফ আয়োজিত এক অনুষ্ঠান থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে রাঙ্গামাটি জেলার কাপ্তাই উপজেলার মিতিনগাছড়ি এলাকায় চার হাজারতম পাড়া কেন্দ্রটির উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভী ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি র.আ.ম. ওবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী এমপিও অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী বীর বাহাদুর উশৈ সিং এমপি। প্রধানমন্ত্রী ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে রাঙ্গামাটির কাপ্তাই ইউনিয়নের মিতিঙ্গাছড়িতে স্থানীয় সুবিধাভোগী ও জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলেন। উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে এক সময় রক্তক্ষয়ী-সংঘাত ছিল। এই সংঘাতের কারণ-সমস্যা চিহ্নিত করেই আওয়ামী লীগ শান্তি চুক্তি করে। চুক্তিতে বাধা এলেও বেশিরভাগই বাস্তবায়ন হয়ে গেছে। এ চুক্তি পুরোপুরি বাস্তবায়নে কাজ চলছে। আগের সরকারগুলো সমতল ভূমি থেকে মানুষদের সেখানে নিয়ে সংঘাত উস্কে দিয়েছিল। কিন্তু শান্তি চুক্তির মাধ্যমে এই সংঘাতের পথ বন্ধ করে দেয় আওয়ামী লীগ সরকার। পাহাড়ে অশান্তি প্রতিরোধে পার্বত্যবাসীকে সজাগ থাকার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘পার্বত্য অঞ্চলের মানুষকে আমি বলব, শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হবে। কারণ শান্তিপূর্ণ পবিবেশ ছাড়া উন্নয়ন সম্ভব নয়। সেটা মাথায় রেখেই আমি সকলকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানাচ্ছি। ইনশা আল্লাহ বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাবে।’ বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর সামরিক শাসকরা পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যাকে ‘আরও প্রকট করে’ তুলেছিল বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী। ‘সমতল ভূমি থেকে বিভিন্ন লোককে নিয়ে ওখানে বসতি করা শুরু করে দেয়। তাদের ক্যাম্পে রাখা হয় এবং সেখানে সংঘাতটা আরও উস্কে দেয়া হয়। এরপর ১৯৯৬ সালে তার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে তৃতীয় শক্তির সাহায্য ছাড়া শান্তি চুক্তি করে শান্তিপূর্ণভাবে সমস্যার সমাধান হয় বলে উল্লেখ করেন তিনি। শেখ হাসিনা বলেন, সেখানে তাদের জন্য প্রশাসনিক ভবন ডরমেটরিসহ সব করা হবে। ঢাকায় কাজে আসলে সেখানে পার্বত্য এলাকার লোকজন স্বল্পখরচে থাকতে পারবেন। পার্বত্য চট্টগ্রামে যেমন ঘরবাড়ি হয় তেমন দৃষ্টিনন্দন হবে এই কমপ্লেক্স। এছাড়া আমরা চাকমা, মারমা ত্রিপুরা ভাষায় যে অক্ষর আছে, আমরা সেই অক্ষরে তাদের নিজস্ব ভাষায় বই ছাপিয়ে দিয়েছি। পাহাড়ে শিক্ষাকে আমরা সর্বাধিক গুরুত্ব দিচ্ছি। পার্বত্য অঞ্চলে যেন মাদক উৎপাদন না হয়। সেইসঙ্গে পার্বত্য এলাকায় পাহাড়ীদের পাহাড়ী ফলের চাষ করার আহ্বান জানান। পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য সমন্বিত সমাজ উন্নয়ন প্রকল্পের (আইসিডিপি) আওতায় ইউনিসেফ ও পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড যৌথভাবে পাড়া কেন্দ্র নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠা ও বাস্তবায়ন করছে, যা বর্তমানে তিন পাহাড়ী জেলা রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ির মানুষের মৌলিক সামাজিক সেবা প্রাপ্তির মূল কেন্দ্র হিসেবে কাজ করছে। চার হাজারতম পাড়া কেন্দ্র চালুর এই মাইলফলকের মধ্য দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে বসবাস করা ১৬ লাখ মানুষ ও ১১টি বিভিন্ন ক্ষুদ্র ও নৃ-গোষ্ঠীর মৌলিক সামাজিক সেবা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বেশ সহায়ক হবে এবং এটি এখানকার সুবিধাবঞ্চিত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নেও ভূমিকা রাখবে। শান্তিচুক্তি পুরোপুরি বাস্তবায়িত না হওয়ায় ‘নিপীড়ন-নির্যাতনে’ জুম্মদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হচ্ছে বলে সম্প্রতি চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী জনসংহতি সমিতির নেতা সন্তু লারমা উদ্বেগ জানিয়েছেন। এ বিষয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে প্রায় আড়াই শ’র মতো সেনা ক্যাম্প আমরা প্রত্যাহার করেছি। সেখানে সার্বিক নিরাপত্তার জন্য বর্ডার গার্ডের বিওপি তৈরি করেছি, যা আগে কখনও ছিল না।’ চার হাজারতম পাড়া কেন্দ্রের মাধ্যমেই শেষ হতে যাওয়া এ প্রকল্পের উদ্বোধন করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নতুন আরেকটি প্রকল্প চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলমান প্রকল্পের জনবলকে নতুন প্রকল্পে নিয়ে যাওয়াসহ আরও কর্মসংস্থানের আশ্বাসও দেন তিনি। শেখ হাসিনা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে তার সরকারের এই উন্নয়নের ধারাটা যেন অব্যাহত থাকে সেজন্যই এই নতুন প্রকল্প নেয়া হচ্ছে। ১৯৯৭ সালে শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামের দীর্ঘ ২৫ বছরের অস্থিরতা নিরসনে এবং সেখানে টেকসই উন্নয়নের পথ তৈরি করতে প্রধানমন্ত্রী ও তার সরকারের ঐতিহাসিক ভূমিকার প্রশংসা করে তিনি এই অঞ্চলে ইউনিসেফের সহায়তা অব্যাহত রাখার আশ্বাস পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি, সুরক্ষা, পানি ও স্যানিটেশনের মতো ন্যায়সঙ্গত সামাজিক সেবাসমূহ নিশ্চিত করতে এখনও অনেক কাজ বাকি, বিশেষ করে, দুর্গম পাহাড়ী এলাকায়। তিনি আরও উল্লেখ করেন, পাড়া কেন্দ্রগুলো ইসিডি কেন্দ্রের সর্বোত্তম উদাহরণ এবং শৈশবকালীন প্রারম্ভিক উন্নয়নের গুরুত্ব বিবেচনায় পাড়া কেন্দ্রগুলোকে বিশেষায়িত ইসিডি কেন্দ্রে রূপান্তর করা যেতে পারে এবং বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ওয়ান স্টপ মৌলিক সামাজিক সেবা প্রদানে ‘পাড়া কেন্দ্র পদ্ধতি’ এর মডেল অনুসরণ করা যেতে পারে। স্বতন্ত্র জনসংখ্যাতাত্ত্বিক, ভূমি, সামাজিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামের সম্প্রদায়গুলো বহুবিধ বঞ্চনার সম্মুখীন হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সামাজিক উন্নয়নে বাংলাদেশে ধারাবাহিক অগ্রগতি অর্জন করলেও পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলায় এই অর্জনের সমান প্রতিফলন নেই এবং বাংলাদেশে জাতিসংঘের উন্নয়ন সহায়তা কাঠামোর জন্য এই জেলাগুলো পিছিয়ে পড়া জেলা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। উন্নয়নের মূলধারায় পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে প্রচারণা চালাতে ইউনিসেফ ও বাংলাদেশ সরকার যৌথভাবে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি জীবনচক্র পদ্ধতি ব্যবহার করার মাধ্যমে পাড়া/ গ্রাম কেন্দ্র পদ্ধতি প্রণয়ন করে। এর উদ্দেশ্য ছিল পাড়া কর্মীদের বিস্তৃত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সমন্বিত মৌলিক স্বাস্থ্য সেবা, পুষ্টি, শিক্ষা, ওয়াশ ও শিশু সুরক্ষা নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রান্তিক সম্প্রদায়গুলোর জন্য মৌলিক সামাজিক সেবাগুলো প্রাপ্তি ও ব্যবহারের সুযোগ বাড়ানো।