নির্দিষ্ট সময়ে প্রত্যাবাসন শুরু করতে না পারার দায় বাংলাদেশের কাঁধেই চাপাচ্ছে মিয়ানমার। দেশটির আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বিষয়ক মন্ত্রী কিয়াউ তিন গতকাল মঙ্গলবার নেপিডোতে সাংবাদিকদের বলেছেন, তাঁর দেশ চুক্তি অনুযায়ী যেকোনো সময় রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে প্রস্তুত আছে। কিন্তু বাংলাদেশই প্রস্তুত নয়। শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ আবুল কালাম কালের কণ্ঠকে নিশ্চিত করেছেন, প্রত্যাবাসনপ্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তবে বেশ কিছু কাজ বাকি আছে।কূটনৈতিক সূত্রের দাবি, প্রবল বৈশ্বিক চাপে পড়েই মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের যাচাই-বাছাই সাপেক্ষে ফিরিয়ে নেওয়ার অঙ্গীকার এবং বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তি করেছে। এ চুক্তি অনুযায়ী গতকাল থেকে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন শুরু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এর আগে যে বিশাল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে সে সম্পর্কে মিয়ানমারও অবগত। এর পরও দেশটি প্রত্যাবাসন শুরু করতে না পারার জন্য বাংলাদেশকে দোষারোপ করে বিশ্বসম্প্রদায়কে দেখাতে চাইছে, তারা রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে বেশ আন্তরিক। অথচ রোহিঙ্গারা ফিরে যেতে উৎসাহিত হতে পারে এমন কিছু মিয়ানমার করছে না।এদিকে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে সই হওয়া ৩৩ দফা ‘ফিজিক্যাল অ্যারেঞ্জমেন্টের’ (মাঠপর্যায়ের ব্যবস্থা) ১৯তম দফা অনুযায়ী, মিয়ানমারের যাচাই-বাছাই শেষে প্রত্যাবাসনের জন্য যোগ্য বিবেচিত ব্যক্তিদের তালিকায় যারা থাকবে না তাদের দায়-দায়িত্ব বাংলাদেশের কাঁধেই চাপবে। গত ১৬ জানুয়ারি নেপিডোতে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের (জেডাব্লিউজি) প্রথম বৈঠকে ওই ফিজিক্যাল অ্যারেঞ্জমেন্ট সই হয়।মিয়ানমারে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মেজর জেনারেল (অব.) অনুপ কুমার চাকমা গতকাল বিকেলে কালের কণ্ঠকে বলেন, যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়াটিই অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ যাচাই-বাছাই শেষে মিয়ানমার যাদের রাখাইন রাজ্যের বাসিন্দা ছিল বলে মনে করবে শুধু তাদেরই ফেরত নেবে। তাই যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ার জন্য নির্ভুলভাবে তথ্য সংগ্রহ অত্যন্ত জরুরি।ঢাকার অন্য কূটনীতিকরাও বলেন, বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া মিয়ানমারের ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গার সবাই যে ফিরে যাবে এমনটি নয়। গত ২৩ নভেম্বর সই হওয়া চুক্তি অনুযায়ী, মিয়ানমার প্রথমে ২০১৬ সালের অক্টোবর মাসের পর বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের বিষয়টি বিবেচনা করবে। তাদের ফিরে যাওয়া শেষ হওয়ার পর ২০১৬ সালের অক্টোবর মাসের আগে আসা রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের বিষয়টি বিবেচনায় আসতে পারে।কূটনীতিকরা জানান, প্রত্যাবাসনের জন্য প্রথমত, রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরে যেতে আগ্রহী হতে হবে। দ্বিতীয়ত, যাচাই-বাছাই শেষে মিয়ানমারকেও তাদের ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে আগ্রহী থাকতে হবে। চুক্তি অনুযায়ী প্রত্যাবাসনের জন্য বিবেচনাধীন ২০১৬ সালের অক্টোবর মাসের পর থেকে আসা প্রায় পৌনে আট লাখ রোহিঙ্গার ক্ষেত্রেই এটি প্রযোজ্য। অযাচিত প্রেক্ষাপটে জন্ম নেওয়া বা অনাথ রোহিঙ্গা শিশুদের ক্ষেত্রে প্রক্রিয়াটি আরো জটিল হতে পারে। কারণ তাদের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আদালতের সনদ প্রয়োজন হবে। সম্ভাব্য জটিলতার কথা চিন্তা করেই বাংলাদেশ রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শেষ না হওয়া পর্যন্ত মিয়ানমারের ওপর চাপ অব্যাহত রাখতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়ে আসছে।নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকার এক কর্মকর্তা বলেন, রোহিঙ্গাদের পরিচিতি যাচাই ফরমে পরিবারপ্রধানের নাম, লিঙ্গ, বয়স/জন্ম তারিখ, বাবার নাম, বাবার মিয়ানমারের ঠিকানা, মায়ের নাম, মায়ের মিয়ানমারের ঠিকানা, স্ত্রীর নাম, স্ত্রীর মিয়ানমারের ঠিকানা, স্বামীর নাম, স্বামীর মিয়ানমারের ঠিকানা, শনাক্তকরণ চিহ্ন, পেশা, কার্ড নম্বর, পরিবারের সদস্যসংখ্যা, বাংলাদেশে প্রবেশের তারিখ, পারিবারিক ছবি, প্রত্যেকের আলাদা ছবি, পাঁচ বছরের বেশি বয়সীদের আঙুলের ছাপ এবং বাংলাদেশে আশ্রয়শিবিরের ঠিকানা উল্লেখ করতে হবে। এ ছাড়া ফরমে সই করার মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের ঘোষণা দিতে হবে যে কোনো ধরনের হুমকি বা অনুপ্রেরণায় উদ্বুদ্ধ না হয়ে তারা স্বেচ্ছায় মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার ও বসবাস করার আবেদন করছে। তাদের আরো ঘোষণা দিতে হবে, মিয়ানমারে প্রবেশের জন্য তাদের আবেদন মঞ্জুর হলে তারা মিয়ানমারের বিদ্যমান আইন মেনে চলতে বাধ্য থাকবে। এভাবে পরিবার অনুযায়ী রোহিঙ্গাদের মতামতের ভিত্তিতে ফরম পূরণ করিয়ে বাংলাদেশ সেগুলো মিয়ানমারের কাছে পাঠাবে। বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়ে অভিজ্ঞতার আলোকে ওই কর্মকর্তা বলেন, অনেক সময় দেখা যায় পরিচয়পত্রে কারো নাম ঠিক আছে, বাবা বা মায়ের নাম ভুল এসেছে। এমনটি রোহিঙ্গাদের ফরমের ক্ষেত্রে হলে ভয়াবহ বিপদ। কারণ তখন মিয়ানমারের তথ্যভাণ্ডারের সঙ্গে তাদের তথ্য মিলবে না। ফলে তারা প্রত্যাবাসনের জন্য অযোগ্য বিবেচিত হতে পারে। তাই সময় লাগলেও যাচাই-বাছাইয়ের জন্য নির্ভুল তথ্য-উপাত্ত সংবলিত ফরম পাঠানো খুবই জরুরি।সুরক্ষার নিশ্চয়তা দেখছে না জাতিসংঘ : মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের সুরক্ষার নিশ্চয়তা নেই বলে মনে করছে জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর। সংস্থার মুখপাত্র অ্যাড্রিয়ান এডওয়ার্ড গতকাল জেনেভায় সংবাদ সম্মেলনে এ মূল্যায়ন তুলে ধরেন। তিনি বলেন, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে রোহিঙ্গারা এখনো বাংলাদেশে আসছে। রাখাইনে ত্রাণ কার্যক্রমের ওপর বিধি-নিষেধ অব্যাহত আছে। তিনি আরো বলেন, রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসন এবং এ সংকটের প্রকৃত ও টেকসই সমাধান খুঁজে পেতে ইউএনএইচসিআর মানবিক সহায়তা কর্মীদের রাখাইনে নিরবচ্ছিন্ন প্রবেশাধিকার দিতে মিয়ানমারের প্রতি আবারও আহ্বান জানাচ্ছে। প্রত্যাবাসন পরিকল্পনা স্থগিত চায় এইচআরডাব্লিউ : নিউ ইয়র্কভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডাব্লিউ) রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন পরিকল্পনাকে তাদের নিরাপত্তা ও মঙ্গলের জন্য হুমকি হিসেবে উল্লেখ করে সেটি স্থগিত করতে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। সংস্থার এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক ব্র্যাড অ্যাডামস বলেন, ‘যে বর্মি (মিয়ানমারের) বাহিনীর অগ্নিসংযোগ, হত্যাযজ্ঞ ও গণধর্ষণের পরিপ্রেক্ষিতে রোহিঙ্গারা পালাতে বাধ্য হয়েছিল, তাদের আবারও সেই বাহিনীর পাহারায় থাকা শিবিরে ফেরানো উচিত হবে না।’ তিনি বলেন, মিয়ানমার নিরাপদ ও স্থায়ী প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নেয়নি।ইয়াংহি লিকে স্বাধীনভাবে কাজে সুযোগ দেবে বাংলাদেশ : মিয়ানমারে মানবাধিকার পরিস্থিতি বিষয়ক জাতিসংঘের স্পেশাল র‌্যাপোর্টিয়ার (বিশেষ দূত) ইয়াংহি লিকে বাংলাদেশে যখন যেভাবে ইচ্ছা কাজ করতে দেবে ঢাকা। ইয়াংহি লি গতকাল বিকেলে পররাষ্ট্রসচিব মো. শহিদুল হকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এলে তাঁকে এ কথা বলা হয়েছে।মিয়ানমার ইয়াংহি লিকে কোনো ধরনের সহযোগিতা করতে অস্বীকৃতি জানানোর পর গত ১৭ জানুয়ারি তিনি বাংলাদেশে আসেন। সাত দিনের বাংলাদেশ সফরের বেশির ভাগ সময়ই তিনি কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শিবিরে কাটান এবং তাদের ওপর নিপীড়নের বিষয়ে খোঁজ নেন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলেছেন, ইয়াংহি লি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছেন যে তাঁর এই সফরের বিষয়ে একটি প্রতিবেদন তিনি আগামী মার্চ মাসে জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদে উপস্থাপন করবেন। আসন্ন বর্ষা মৌসুমে রোহিঙ্গা শিবিরের পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে তিনি রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন শুরুর আগে রাখাইন পরিস্থিতির আরো উন্নতি হওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।এদিকে আজ বুধবার ঢাকায় মিয়ানমারের নাগরিকবিষয়ক জাতীয় টাস্ক ফোর্সের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। পররাষ্ট্রসচিবের নেতৃত্বে ওই বৈঠকে রোহিঙ্গা শিবিরে সাম্প্রতিক সহিংসতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হতে পারে।