চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মামলার রায় সামনে রেখে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে বিএনপি। কারণ খালেদা জিয়ার সাজা হলে দল কিভাবে পরিচালিত হবে সে প্রশ্ন যেমন দলটির সামনে এসেছে, তেমনি এসেছে খালেদা জিয়াকে ছাড়া নির্বাচনে যাওয়া-না যাওয়ার প্রশ্নও। আবার ওই ইস্যুতে আন্দোলনে যাওয়া, না যাওয়ার প্রশ্নেও বিএনপি কৌশলগতভাবে উভয় সংকটে পড়েছে। বিএনপি নেতাদের মতে, কঠোর আন্দোলন করতে গেলে সরকার সমর্থকরাই নানাভাগে অগ্নিসংযোগ ও সহিংসতা তৈরি করে দায় বিএনপির ওপর চাপাবে। আর ওই ঘটনার সূত্র ধরেই ‘আগুন সন্ত্রাসী’ তকমা দিয়ে আবারও দায়ের করা হবে হাজার হাজার মামলা। এভাবেই নির্বাচনের আগে প্রেক্ষাপট তৈরি করে বিএনপির নেতাকর্মীদের জেলখানায় ভরা হবে। দলটির নীতিনির্ধারকরা বলছেন, নির্বাচনের আগে বিএনপিকে কোণঠাসা করতেই সরকারের আগাম এই পরিকল্পনা, যে খবর এরই মধ্যে তাঁরা জানেন। বিএনপির স্থায়ী কমিটির কয়েকজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ২০১৫ সালের ৫ জানুয়ারিকে কেন্দ্র করে গড়ে তোলা আন্দোলনের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে এ মুহূর্তে আন্দোলনে যাওয়া বেশ কঠিন। ওই নেতাদের আরো অনেক কথার মধ্যে দুজনের একটি কথা অভিন্ন সেটি হলো, ‘আমরা সরকারের ফাঁদে পা দেব না।’ অন্যদিকে দলের চেয়ারপারসনের সাজা হলে কৌশলগত কারণে নীরব থাকাও সম্ভব নয় বিএনপির পক্ষে। কারণ প্রথমত, এতে বিএনপিকে দুর্বল বলে মনে করা হবে। দ্বিতীয়ত, দলের নেতাকর্মীদের আবেগ দমিয়ে রাখাও কঠিন। আবার খালেদা জিয়াও আন্দোলনের পক্ষে। ফলে সতর্ক থেকে এবং দলের নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণে রেখে সুষ্ঠুভাবে আন্দোলন পরিচালনা করা বিএনপির জন্য কঠিন। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী মনে করেন, বিএনপির এখনকার সংকট দলটিকে চাপে রাখতে সরকারের কৌশল। তবে তাদের (বিএনপির) ভুল হলো খালেদা জিয়ার বিকল্প তারা কোনো নেতৃত্ব তৈরি করেনি। বিকল্পধারার সভাপতি কালের কণ্ঠকে বলেন, তারেক রহমান বিদেশে, তাঁর পক্ষে নেতৃত্ব দেওয়া সম্ভব নয়। দ্বিতীয়ত, আন্দোলনে গেলে সরকার বিএনপির ওপর চড়াও হবে, মামলা দেবে। এ ব্যাপারে সম্ভবত বিএনপি এবার সতর্ক থাকবে। তৃতীয়ত, নির্বাচনে যাওয়া-না যাওয়ার প্রশ্নে সংকটে থাকলেও ভোটাররা তাদের পক্ষে আছে বলে বিএনপির ধারণা। ফলে ঠিকমতো সামাল দিতে পারলে সংকট তারা উতরে যেতেও পারে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের মতে, বিএনপিকে গত এক-এগারো থেকে সরকার নানাভাবে ষড়যন্ত্র করে সংকটের মধ্যে ফেলছে। কিন্তু এতে বিএনপির জনপ্রিয়তা কমেনি, বরং তিন গুণ বেড়েছে। এখন সরকার কৃত্রিম সংকট তৈরি করে চাপে ফেলার চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি ঐক্যবদ্ধ আছে। সব প্রতিকূল অবস্থা কাটিয়ে বিএনপি ঘুরে দাঁড়াবে।
দলের স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, ‘আমাদের সংকট আছে, অস্বীকার করি না। তবে দেশের সার্বিক অবস্থা বিবেচনায় রেখে এর উত্তরণের পথ অবশ্যই আমরা বের করব।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, খালেদা জিয়ার সাজা হলেও পরিস্থিতি সরকারের বিপক্ষে যাবে, সাজা না হলেও বিপক্ষে যাবে। তাঁর মতে, খালেদা জিয়ার সাজা হলে তাঁর জনপ্রিয়তা আরো বেড়ে যাবে। ওই অবস্থায় বিএনপিও বসে থাকবে না। আর সাজা না হলে প্রমাণিত হবে সরকার অযৌক্তিকভাবে তাঁকে মামলা দিয়ে ফাঁসানোর চেষ্টা করেছে। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, সরকার নার্ভাস হয়ে এখন ভিন্নপথে মাঠে নেমেছে। তাঁর মতে, যদি সরকার মনে করত যে তারা ভোটে জয়লাভ করবে, তাহলে বিএনপিকে চাপে ফেলার এই অপকৌশলের প্রয়োজন হতো না। কিন্তু দেখছে যে ভোটের রাজনীতিতে তাদের ভবিষ্যৎ নেই, তাই বিএনপিকে নেতৃত্বশূন্য করার ষড়যন্ত্রে নেমেছে। তিনি বলেন, কিন্তু এর কোনো ফলই সরকারের অনুকূলে যাবে না। ২০১৫ সালের ৫ জানুয়ারি ঘিরে বিএনপির নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আন্দোলন চলাকালে গাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় দগ্ধ হয়ে সারা দেশে মোট ১৩১ জনের প্রাণহানি ঘটে। ওই ঘটনাসহ বিভিন্ন অভিযোগে বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে সারা দেশে মোট ৫০ হাজার মামলা দায়ের করা হয়, যাতে আসামির সংখ্য ১২ লাখ। ওই ঘটনায় বিএনপিকে আগুন সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হয়। তবে বিএনপি মনে করে, তাদের নেতাকর্মীরা যদি একটি গাড়িতে আগুন দিয়ে থাকে, সরকার সমর্থকরা আরো তিনটি গাড়িতে আগুন দিয়ে ওই সময় পরিস্থিতির অবনতি ঘটিয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো বিএনপিকে ‘জঙ্গি-সন্ত্রাসী’ আখ্যা দেওয়া, যে কৌশলে সরকার অনেকটাই সফলতা পেয়েছে বলে বিএনপি মনে করে। দলীয় সূত্রে জানা যায়, কৌশলগত এ সমস্যার কারণেই গত শনিবার রাতে দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকে ‘এককথায়’ কঠোর আন্দোলনের প্রস্তাব দেননি উপস্থিত কোনো নেতা। বরং এ প্রশ্নে সিদ্ধান্ত তৃণমূল নেতাদের মতামতের ওপর তাঁরা ছেড়ে দিয়েছেন। সে কারণে মামলার রায়ের ধার্য দিনের (৮ ফেব্রুয়ারি) আগে দলের নির্বাহী কমিটির সভা ডাকা হয়েছে। একটি সূত্রের দাবি, আগামী ৩ ফেব্রুয়ারি ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে ওই সভা করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে গতকাল রবিবার আবেদন করেছে বিএনপি। এদিকে দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠক আজ সোমবারও আবার ডাকা হয়েছে গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে। সূত্র মতে, শনিবারের বৈঠকে দলের স্থায়ী কমিটির দুজন সদস্য বলেন, খালেদা জিয়াকে জেলখানায় রেখে বা বাদ দিয়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়া যাবে না। তাঁদের ওই কথায় অন্য সবাই সায় দেন। তবে খালেদা জিয়া এ বিষয়ে কোনো মতামত দেননি। তবে খালেদা জিয়া সত্যিকার অর্থে দণ্ডিত হয়ে কারাগারে গেলে বিএনপি নির্বাচনে যাবে কি না, তা নিয়ে দলের মধ্যে উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে। দলের ক্ষুদ্র একটি অংশ যদিও মনে করে যে কারাগারে গেলে খালেদা জিয়ার জনপ্রিয়তা আরো বাড়বে এবং ওই পরিস্থিতিতে নির্বাচনে গেলেও কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু বড় অংশের মতে, খালেদা জিয়াকে সরকার কারাগারে রাখতে সমর্থ হলে নির্বাচন নিয়ন্ত্রণ করতেও সক্ষম হবে। ফলে ওই নির্বাচনে যাওয়ার মধ্যে কোনো লাভ দেখছে না তারা। যদিও এ প্রশ্নে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত খালেদা জিয়া গতকাল পর্যন্ত নেননি বলে বিএনপি নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে। ফৌজদারি মামলায় সাজা হলে খালেদা জিয়া নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন কি না, তা নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা ঘুরপাক খাচ্ছে রাজনৈতিক অঙ্গনে। সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদের (২) দফায় বর্ণিত বিধান অনুসারে কোনো ব্যক্তি সংসদের সদস্য নির্বাচিত ‘হইবার এবং সংসদ সদস্য থাকিবার যোগ্য হইবেন না, যদি…তিনি নৈতিক স্খলনজনিত কোনো ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হইয়া অন্যূন দুই বৎসরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন এবং তাঁহার মুক্তিলাভের পর পাঁচ বৎসরকাল’ অতিবাহিত না হয়ে থাকে। তবে ফৌজদারি মামলায় নিম্ন আদালতে সাজা হলেও উচ্চ আদালতে খালেদা জিয়ার আপিল করার সুযোগ রয়েছে। উচ্চ আদালত ওই রায় স্থগিত কিংবা বাতিল করলে খালেদা জিয়া নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ পাবেন। অন্যদিকে অর্থপাচারের একটি সাত বছরের সাজা মাথায় নিয়ে বিদেশে পলাতক আছেন বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান। পলাতক থাকায় তিনি উচ্চ আদালতে আপিল করেননি এবং এরই মধ্যে তিনি নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষিত হয়েছেন বলে মনে করা হয়। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় তারেক রহমানও আসামি। বিএনপির নেতৃত্ব নিয়ে নানামুখী আলোচনা ঘুরপাক খেলেও এবার দলের সিনিয়র নেতারা এ প্রশ্নে বেশ ঐক্যবদ্ধ। গত কয়েক দিনে নিজেদের মধ্যে তাঁরা দফায় দফায় বৈঠক করেছেন। আলোচনায় তাঁরা একমত হয়েছেন যে কারাগারে থাকলেও খালেদা জিয়াই দলের নেতৃত্ব দিতে পারবেন। আর বাইরে দলের স্থায়ী কমিটিসহ সিনিয়র নেতারা দল পরিচালনা করবেন। একটি সূত্রের দাবি, দলের স্থায়ী কমিটির ছয় সদস্য এবং সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিবকে এই দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। এ প্রসঙ্গে দলের গঠনতন্ত্র নিয়েও আলোচনা করেন তাঁরা। গত শনিবার স্থায়ী কমিটির বৈঠকেও বিষয়টি ওঠে। সংশ্লিষ্ট এক নেতা এ প্রসঙ্গে কালের কণ্ঠকে জানান, এরই মধ্যে দলের গঠনতন্ত্রে এ সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় ধারা সংশোধন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জানা গেছে, গতকাল সংশোধিত ওই গঠনতন্ত্র নির্বাচন কমিশনে জমা দিয়েছে বিএনপি। জমা দেওয়ার আগের গঠনতন্ত্রে ৭ নম্বর ধারায় উল্লেখ ছিল, ১৯৭২ সালের রাষ্ট্রপতির ৮ নম্বর আদেশবলে দণ্ডিত, দেউলিয়া, উন্মাদ বলে প্রমাণিত ও সমাজে দুর্নীতিপরায়ণ বা কুখ্যাত বলে পরিচিত ব্যক্তি দলের জাতীয় কাউন্সিল, জাতীয় নির্বাহী কমিটি, জাতীয় স্থায়ী কমিটি বা যেকোনো পর্যায়ের যেকোনো নির্বাহী কমিটির সদস্য পদের কিংবা জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের প্রার্থী পদে অযোগ্য বলে বিবেচিত হবেন। এই বিধানকে বিএনপি আপেক্ষিক বলে মনে করে। জানা যায়, এই বিধানের মধ্যে উন্মাদ ও দেওলিয়া—এই দুই শ্রেণির পাশাপাশি দেশদ্রোহীরাও সদস্য পদে অযোগ্য হবেন বলে সংশোধিত গঠনতন্ত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে দণ্ডিত ও দুর্নীতিপরায়ণ—এই দুটি বিষয় তুলে দেওয়া হয়েছে। বিএনপি নেতারা জানান, দলের নেতাদের বিরুদ্ধে অসংখ্য মামলা-মোকদ্দমা থাকায় তাঁদের দণ্ড হতে পারে—এ বিষয়টি বিবেচনায় এনে গত কাউন্সিলেই গঠনতন্ত্রের সংশ্লিষ্ট ওই ধারা বিএনপি পরিবর্তন করেছে; যা গতকাল রেজুলেশন আকারে নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হয়। কিন্তু এর পরও খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে বিএনপি কিভাবে চলবে সেই প্রশ্ন ও আলোচনা আড়াল করা যাচ্ছে না। সুধীসমাজসহ দলটির সমর্থক গোষ্ঠীর মধ্যেও এ প্রশ্ন বারবার উঠছে। বিএনপির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী চেয়ারম্যানের অনুপস্থিতি বা কোনো কারণে চেয়ারম্যানের পদ শূন্য হলে দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন বলে উল্লেখ আছে। কিন্তু তারেক রহমান একটি মামলায় দণ্ডিত হয়ে প্রায় ১০ বছর ধরে লন্ডনে বাস করছেন। এ অবস্থায় তিনি কিভাবে নেতৃত্ব দেবেন, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। যদিও তারেক লন্ডনে বসেই নেতৃত্ব দিতে চাইছেন বলে তাঁর ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো থেকে জানা গেছে। সূত্র মতে, এ পরিস্থিতিতে অনেকেই বিকল্প হিসেবে তাঁর স্ত্রী ডা. জোবাইদা রহমানকে নিয়ে চিন্তা করছেন। অনেকের মতে, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের পর দলের ভেতরে ও বাইরে তাঁর সমান জনপ্রিয়তা রয়েছে। কিন্তু এতে আবার তারেক রহমানের সম্মতি নেই বলে জানা যায়। আবার খালেদা জিয়াও এ বিষয়ে খুব বেশি আগ্রহী নন। এ ছাড়া ‘অবৈধ সম্পদ অর্জনের’ অভিযোগে জোবাইদার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে একটি মামলা রয়েছে। দেশে ফেরার পর সরকার ইচ্ছা করলে তাঁকে গ্রেপ্তার করতে পারে। সব মিলিয়ে সাজা হলে দলের নেতৃত্ব কী দাঁড়াবে, তা নিয়ে দলে কিছুটা অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে বলে জানা গেছে।