মাতারবাড়ীতে বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণকাজ উদ্বোধনীতে প্রধানমন্ত্রী লাভবান হবে পুরো দেশ

কক্সবাজারের মহেশখালীর মাতারবাড়ীতে এক হাজার ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণকাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ সময় তিনি বলেন, এর ফলে স্থানীয় মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নতির পাশাপাশি সারা বাংলাদেশ লাভবান হবে। গতকাল রবিবার দুপুরে প্রধানমন্ত্রী তাঁর সরকারি বাসভবন গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে দেশের অন্যতম বড় এই বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। জাইকার অর্থায়নে নির্মাণাধীন এই প্রকল্পের প্রাথমিক অবকাঠামোর ১৭ শতাংশ কাজ এরই মধ্যে শেষ হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে মূল নির্মাণকাজ শুরু হলো। কেন্দ্রটি নির্মাণ করছে কোল বাংলাদেশ পাওয়ার জেনারেশন কম্পানি। অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা বলেন, ‘ঘরে ঘরে বিদ্যুতের আলো জ্বলাটা এখন শুধু সময়ের ব্যাপার মাত্র। দেশের প্রায় ৯০ ভাগ মানুষই বিদ্যুৎ পেয়ে গেছেন। আর ১০ ভাগ মানুষও পাবেন, সেদিকে লক্ষ্য রেখেই সরকার কাজ করে যাচ্ছে।’ তিনি বলেন, যেখানে বিদ্যুতের গ্রিড লাইন নাই সেখানে তাঁর সরকার সোলার সিস্টেম ইনস্টল করে দিচ্ছে। সরকারের অগ্রাধিকারের ১০ প্রকল্পের মধ্যে খরচের দিক দিয়ে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরই রয়েছে মাতারবাড়ীর প্রকল্পটি। মাতারবাড়ী ও ধলঘাটা ইউনিয়নের ১৪১৪ একর জমিতে জাপান সরকারের সহযোগিতায় এবং জাপানের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগিতা সংস্থা জাইকার অর্থায়নে ৩৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হচ্ছে। সারা পৃথিবীতে এটিই জাইকার সবচেয়ে বড় অর্থায়নের প্রকল্প বলে অনুষ্ঠানে জানানো হয়। এই বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের আওতায় যে বন্দর নির্মাণ করা হবে, পরে তাকে গভীর সমুদ্রবন্দরে রূপান্তরিত করা হবে। বন্দরসহ এই প্রকল্পের বাস্তবায়নে খরচ হবে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা। ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আজ মহেশখালী দ্বীপে আমরা যে কাজগুলো করে যাচ্ছি, এর ফলে ওই এলাকার মানুষের যেমন আর্থ-সামাজিক উন্নতি হবে, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পাবে, পাশাপাশি বাংলাদেশও লাভবান হবে।’ বিদ্যুৎ নিয়ে সরকারের মহাপরিকল্পনায় দ্বীপ উপজেলা মহেশখালীর মাতারবাড়ীকে ‘বিদ্যুৎ হাব’ হিসেবে গড়ে তোলার ঘোষণা রয়েছে। সরকার আশা করছে, বিদ্যুৎকেন্দ্র, এএনজি টার্মিনাল ও দেশের প্রথম গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ হলে মাতারবাড়ী একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে গড়ে উঠবে। শেখ হাসিনা বলেন, ‘প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে যারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তাদের ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা আমরা করেছি, ভবিষ্যতে আরো করব এবং তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নেব। এ ব্যাপারে জাপান সরকার যথেষ্ট সহায়তা দিচ্ছে।’ ওই এলাকায় পর্যটন ব্যবস্থার উন্নয়নের পাশাপাশি টাউনশিপ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হবে বলেও জানান তিনি। ২০১৬ সালে গুলশানে হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলার ঘটনায় সাতজন জাপানি প্রকৌশলী নিহত হওয়ার পর মাতারবাড়ী প্রকল্পও সংশয়ে পড়েছিল। শেষ পর্যন্ত গত বছর জুলাইয়ে জাপানের তিনটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এ প্রকল্পের নির্মাণকাজের জন্য চুক্তি করে বাংলাদেশ। জঙ্গি হামলায় জাপানি নাগরিকদের মৃত্যুতে প্রধানমন্ত্রী দুঃখ প্রকাশ করেন এবং ‘এত ঘটনার’ পরেও জাপানিরা যে বাংলাদেশে কাজ করে যাচ্ছে, সে জন্য তাদের ধন্যবাদ জানান। মাতারবাড়ীতে কর্মরত বিদেশিদের নিরাপত্তার জন্য স্থানীয়দেরও সজাগ থাকার আহ্বান জানান তিনি। ২০১৫ সালের আগস্টে মাতারবাড়ীতে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে ৩৬ হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদন করে সরকার। একনেকে অনুমোদন পাওয়া প্রকল্পের কার্যপত্রে বলা হয়, জাইকা এই প্রকল্পে ২৯ হাজার কোটি টাকা দেবে। মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রের কয়লা আনার জন্য যে বন্দরটি নির্মাণ করা হচ্ছে, সেখানে ৮০ হাজার মেট্রিক টন ধারণক্ষমতার জাহাজও ভিড়তে পারবে। পরে যাতে বহুমুখী কাজে ব্যবহার করা যায়, সে লক্ষ্যেই এ বন্দর নির্মাণ করা হচ্ছে। সরকার আশা করছে, ২০২৩ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করা সম্ভব হবে। স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের পুনর্গঠনে জাপানের ভূমিকার কথা স্মরণ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘এখনো আমাদের বন্ধুত্ব অটুট রয়েছে। উন্নয়নের জন্য জাপান বিরাটভাবে আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছে।’ সে জন্য জাপান সরকারকে, বিশেষ করে সে দেশের প্রধানমন্ত্রীকে আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ জানান শেখ হাসিনা। আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে গত ৯ বছরে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়নের তথ্যও অনুষ্ঠানে তুলে ধরেন তিনি। ইতিমধ্যে দেশের ৯০ ভাগ মানুষ বিদ্যুেসবা পাচ্ছে জানিয়ে সরকারের বিদ্যুত্নীতির সমালোচকদের উদ্দেশে শেখ হাসিনা বলেন, ‘বাংলাদেশে নতুন কিছু করতে গেলেই বাধা আসে। নানা রকম ফর্মুলা এসে যায়। অনেক তাত্ত্বিক গজিয়ে যায়। কেউ কেউ আছে হতাশায় ভোগে। কিছু করতে গেলেই বলে, গেল গেল সব গেল। আমি হতাশার লোক না। আমি সব সময় আশাবাদী। বাংলাদেশের মানুষকে উন্নত জীবন দিতে চাই।’ রোহিঙ্গাদের মানবিক কারণে আশ্রয় দেওয়ায় বাংলাদেশ কিছুটা সমস্যায় রয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা মিয়ানমারের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করছি, যত দ্রুত সম্ভব তাদের এই নাগরিকদের তারা ফেরত নিতে পারে।’ গণভবনে অনুষ্ঠানের শুরুতে প্রকল্প নিয়ে একটি ভিডিও প্রেজেন্টেশন উপস্থাপন করেন বিদ্যুৎসচিব আহমেদ কায়কাউস। প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. নজিবুর রহমান ভিডিও কনফারেন্সটি সঞ্চালনা করেন। জাপানের প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ উপদেষ্টা কেনতারো সনুউরা এবং জাইকার জ্যেষ্ঠ সভাপতি ইনিচি ইয়ামাদাসসহ জাপানি প্রতিনিধিরা গণভবনে উপস্থিত ছিলেন। আর মহেশখালীতে ছিলেন জাপানের রাষ্ট্রদূত হিরোইসু ইজুমিসহ আরেকটি প্রতিনিধিদল। এর মধ্যে ছিলেন সংসদ সদস্য আশেক উল্লাহ রফিক, আব্দুর রহমান বদি, সাইমুম সরওয়ার কমল, হাজি ইলিয়াছ, জাইকার প্রতিনিধি তাকাতোশি নিশিকাতা, কোল পাওয়ারের এমডি আবুল কাশেম, অধিগ্রহণকৃত জমির একজন মালিক রুহুল আমিন, স্কুলছাত্রী তানজিলা প্রমুখ।

 

2018-01-29T08:00:21+00:00January 29th, 2018|বাংলাদেশ|
Advertisment ad adsense adlogger