দেশে তৃতীয় লিঙ্গ তথা হিজড়ার সংখ্যা কত? একটি সংখ্যা আছে সমাজসেবা অধিদপ্তরে। সেখানে বলা হয়েছে, দেশে হিজড়ার সংখ্যা ১০ হাজার ৩১৯ জন। অন্যদিকে হিজড়া কল্যাণ ফাউন্ডেশনের দাবি, তাদের সংখ্যা ১২ লাখ। ফারাক আকাশ-পাতাল। এই ফারাক নিরসনে সরকার মেডিক্যাল চেক আপের মাধ্যমে জরিপ করে হিজড়াদের পরিচয়পত্র দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একই সঙ্গে হিজড়াদের সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হওয়ার আইন তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। হিজড়া জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীন একটি প্রকল্প আছে সরকারের। তিনটি সেবা দেওয়া হয় অধিদপ্তর থেকে। এগুলো হলো উপবৃত্তি, প্রশিক্ষণ ও বয়স্ক ভাতা। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে এ খাতে মোট বরাদ্দ ১১ কোটি টাকা। হিজড়া সংগঠনগুলো বলছে, এটা একেবারেই অপ্রতুল। এ অপ্রতুলতার কথা স্বীকার করেন প্রকল্প পরিচালক আবদুর রাজ্জাক হাওলাদারও। বাংলাদেশ ব্যাংক হিজড়াদের জন্য বিশেষ ঋণের যে উদ্যোগ ঘোষণা করেছিল, তারা সে সুবিধাও ভোগ করতে পারছে না বলে জানিয়েছেন হিজড়া সংগঠনগুলোর নেত্রীরা। রাষ্ট্র স্বীকৃতি দিলেও সমাজ দেয়নি ২০১৩ সালের ১৩ নভেম্বর মন্ত্রিসভার বৈঠকে হিজড়াদের তৃতীয় লিঙ্গের স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এর ফলে এ জনগোষ্ঠী ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছেলে বা মেয়ের বাইরে তৃতীয় লিঙ্গ পরিচয়ে ভর্তি হতে পারবে। এ সুযোগ আগে ছিল না। কিন্তু সরকার স্বীকৃতি দিলেও পরিবার ও সমাজে হিজড়ারা নানাভাবে নিগৃহীত হচ্ছে। পুরান ঢাকার হিজড়া সোহেলী বলেন, ‘একটি ধনাঢ্য বড় পরিবারে জন্ম আমার। বেড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে আমার ভেতরে মেয়েলি ভাব দেখা দেয়। আমি ছেলে কিন্তু খেলায় পছন্দ ছিল মেয়েদের সঙ্গে। কিন্তু কোনো পক্ষই খেলতে নিত না আমাকে। বাড়িতে গিয়েও বকা শুনতে হতো, কেন মেয়েদের সঙ্গে খেলতে যাই। স্কুলেও একই সমস্যা ছিল। ভর্তি হলাম ছেলেদের সঙ্গে, কিন্তু কথায় মেয়েলি টান থাকায় এ নিয়ে অন্যরা তামাশা করত। দুঃখ-যন্ত্রণায় শেষ পর্যন্ত হিজড়াদের দলে ভিড়ে যাই।’ সোহেলী বলেন, ‘পরিবার মেনে নিলে হয়তো পরিবারেই থাকতাম। হিজড়া হয়ে অন্যের কাছে চেয়ে খাওয়ার জীবন আমার হতো না।’ হিজড়া কল্যাণে ২১ সংগঠন তবে হিজড়া জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে সারা দেশে কাজ করে এমন ২১টি সংগঠনের তথ্য পাওয়া যায়। বেশির ভাগ আঞ্চলিক, ঢাকায় কাজ করে ১০টি সংগঠন। সূত্র মতে, এসব সংগঠনের বেশির ভাগ হিজড়াদের গঠন করা। এ ছাড়া কয়েকটি এনজিও হিজড়াদের নিয়ে কাজ করে। ঢাকার সংগঠনগুলো হচ্ছে সচেতন সমাজসেবা হিজড়া সংঘ, সম্পর্কের নয়া সেতু, সুস্থ জীবন, সাদাকালো, বন্ধু, বাঁধন, পদ্মকুড়ি, লোসাউ, বাংলাদেশ হিজড়া কল্যাণ ফাউন্ডেশন ও পুল। গুরু সংস্কৃতি ও ঢাকায় হিজড়াদের ১২ গ্রুপ হিজড়াদের মধ্যে চালু আছে গুরু সংস্কৃতি। প্রতিটি গ্রুপে একজন গুরু আছে। সবাই গুরুর নির্দেশ মেনে চলে। সাধারণ হিজড়ারা জানিয়েছে, এই গুরু সংস্কৃতির কাছে তারা খুবই অসহায়। গুরুরা খুবই ভয়ংকর। গুরুরা ডন (জরিমানা) পদ্ধতি প্রয়োগ করে, কেউ তাদের কথার বাইরে গেলে বড় অঙ্কের জরিমানা করা হয়। অনেক সময় বন্দি করে রাখা হয়, শারীরিক নির্যাতন করা হয়। রাজধানীতে এমন ১২ গুরুর নিয়ন্ত্রণে আছে এলাকাভিত্তিক ১২টি গ্রুপ। মিরপুরে আছে দুটি। একটি গ্রুপের গুরু ছিলেন কোকিলা হিজড়া। সম্প্রতি চাঁদার টাকা ভাগাভাগি নিয়ে শিষ্যদের হাতে খুন হয়েছেন তিনি। এ গ্রুপের নতুন গুরু এখনো ঠিক হয়নি বলে জানিয়েছেন এর সদস্যরা। মিরপুরে আরেকটি গ্রুপের গুরু রনি মাস্টার। শাহবাগ এলাকার হিজড়াদের গুরু মুক্তা হিজড়া। পুরান ঢাকায় রয়েছে হিজড়াদের একাধিক গ্রুপ। এখানে এক গ্রুপের গুরু আনোয়ারা হিজড়া, আরেক গ্রুপের নেতৃত্ব দেন হামিদা হিজড়া। অন্য এক গ্রুপের নেতা মেজবা হিজড়া। শাহজাহানপুর এলাকার হিজড়াদের গুরু জয়নাল হিজড়া, খিলগাঁও-গোড়ান এলাকার নেত্রী ময়না হিজড়া, রাজারবাগ এলাকার গুরু ফয়সাল হিজড়া, যাত্রাবাড়ী এলাকার গুরু বকুল হিজড়া। এ ছাড়া সাভারের গুরু কালী হিজড়া ও নবীনগরের নেতৃত্বে আছেন বকুল হিজড়া।
ভিক্ষা, চাঁদাবাজিসহ নানা অপরাধে হিজড়া রাজধানীর বিজয় সরণি, কাকরাইল মোড়, যাত্রাবাড়ীসহ বিভিন্ন মোড়ে, এমনকি বাসে এক অসহনীয় উপদ্রবের নাম ভিক্ষার নামে হিজড়াদের চাঁদাবাজি। চাহিদামতো টাকা না দিলে অশ্লীল মন্তব্য, গায়ের ওপর ঢলে পড়া, থুথু ছিটিয়ে দেওয়াসহ সুযোগ পেলে মোবাইল ফোন নিয়ে দৌড়, স্বর্ণালংকার নিয়ে পালিয়ে যাওয়াসহ নানাভাবে হিজড়াদের হেনস্তার শিকার হচ্ছে নগরবাসী। এ ছাড়া চলে বাসাবাড়িতে গিয়েও চাঁদাবাজি। গত ১১ জানুয়ারি মাতুয়াইলে এক নবজাতককে দেখতে গিয়ে প্রায় ৫০ জন হিজড়ার একটি দল দাবি করে দেড় লাখ টাকা। টাকা না দেওয়ায় নবজাতককে তুলে নিয়ে আসে। এলাকাবাসী ঘেরাও করে উদ্ধার করে নবজাতককে। এ ছাড়া আছে প্রতারণা। নারী সেজে প্রতারণার মাধ্যমে হাতিয়ে নেয় অর্থ। গত ১৮ জানুয়ারি এমন একটি ঘটনা ঘটে কাকরাইল মোড় এলাকায়। এসব পুলিশে জানিয়েও লাভ হয় না। হিজড়া শুনলে এড়িয়ে যায় পুলিশও। রাজধানীতে অপরাধজগতের সঙ্গেও জড়িয়ে পড়ছে হিজড়ারা। খুন থেকে ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত হচ্ছে তারা। আসল-নকল হিজড়া দ্বন্দ্ব নাম স্বপ্না হিজড়া। বাড়ি কিশোরগঞ্জে। থাকেন ঢাকায়। গ্রামে স্ত্রী-সন্তান আছে। ভারত থেকে অপারেশন করে হিজড়া বেশ ধারণ করে জীবিকার সন্ধানে নেমেছেন। নাম রফিকুল ইসলাম খুশী। বাড়ি ফরিদপুর। জীবিকার তাগিদে মায়ের সঙ্গে এসেছিলেন ঢাকায়। দালালের খপ্পরে পড়ে অপারেশন করে হিজড়া হয়ে যান। জড়িয়ে পড়েন অপরাধে। রাজধানীতে এ ধরনের রূপান্তরিত হিজড়ার সংখ্যা কম নয়। এরা মূল হিজড়াদের দলে মিশে থাকলেও তাদের দায় নিতে রাজি নয় প্রকৃত তথা জন্মগত হিজড়ারা। তাদের ভাষায় এরা নকল। হিজড়া সংগঠন সচেতন সমাজসেবা সংঘের সভাপতি ইভান আহমেদ এদের সম্পর্কে বলেন, ‘চোর তো চোরই, অপরাধী সব সমাজেই আছে। এদের দায় হিজড়া জনগোষ্ঠী কেন নেবে?’ অপ্রতুল বরাদ্দ, কর্মসংস্থানের সুযোগ নেই সরকারি প্রকল্পের অধীনে হিজড়াদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় যোগ্যতা অনুসারে নানা বিষয়ে। কিন্তু সরকারিভাবে তাদের কর্মসংস্থানের কোনো সুযোগ নেই। প্রশিক্ষণের সময়ে দেওয়া হয় প্রতিদিন এক হাজার টাকা। উপবৃত্তি দেওয়া হয় শিক্ষার্থী হিজড়াদের মাসে ৩০০ টাকা। বয়স্ক ভাতা দেওয়া হয় মাসে ৭০০ টাকা। হিজড়া নেত্রী জয়া শিকদার প্রশ্ন রাখেন, ‘মাসে ৭০০ টাকা দিয়ে কিভাবে চলা যায়?’ অন্য একজন বলেন, সরকার যা দেয়, দিনে তাঁরা তার চেয়ে অনেক বেশি আয় করতে পারেন। তাহলে সরকারের কাছে গিয়ে তাঁরা সময় নষ্ট করবেন কেন? সম্পত্তির উত্তরাধিকার আইন হচ্ছে বর্তমানে হিজড়ারা তাদের পৈতৃক সম্পদের উত্তরাধিকার নয়। তারা যাতে সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হতে পারে সে জন্য সরকার একটি আইন তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। আইনটির খসড়া তৈরি হচ্ছে বলে জানান সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক গাজী নজরুল কবীর। অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, মেডিক্যাল চেক আপের মাধ্যমে হিজড়া পরিসংখ্যানের কাজও দ্রুত শুরু হচ্ছে। জরিপের পর দেওয়া হবে আইডি কার্ড। ব্যক্তি উদ্যোগেও কেউ কেউ হিজড়াদের পনর্বাসনের উদ্যোগ নিয়েছে। সম্প্রতি পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের অতিরিক্ত ডিআইজি হাবিবুর রহমান সাভারের হেমায়েতপুরে কয়েকজন হিজড়ার জন্য ‘উত্তরণ ২’ নামের একটি বিউটি পার্লার করে দিয়েছেন। প্রয়োজন দৃষ্টিভঙ্গির বদল হিজড়াদের সংগঠন ‘সম্পর্কের নয়া সেতু’র সভানেত্রী জয়া শিকদার বলেন, হিজড়াদের সমাজের বোঝা বলা হচ্ছে। প্রকল্প চালু করে বা আইন করে এ বোঝা অপসারণ সম্ভব নয়। দরকার দৃষ্টিভঙ্গির বদল। পরিবার যদি তার অন্য সন্তানদের মতো হিজড়া সন্তানকে মেনে নিত তাহলে তারা পরিবারের বাইরে এসে সমাজের বোঝা হয়ে দাঁড়াত না। তাঁর মতে, হিজড়াদের নিয়ে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য সমাজিক বৈঠক হতে পারে, পাঠ্য বইয়ে এ বিষয়ে লেখা থাকতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণ সুবিধা পায়নি হিজড়ারা ২০১৫ সালের ৬ নভেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংক হিজড়াদের ঋণ সুবিধা দেওয়ার একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে, তাতে বলা হয় এনজিওর মাধ্যমে বা ব্যক্তিগত পর্যায়ে হিজড়ারা এসএমই (ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা) ঋণ সুবিধা পাবে। কিন্তু এ ঋণ তারা পাচ্ছে না। বাগেরহাটের সুমাইয়া হিজড়া ও খুলনার ফারুক হিজড়া অভিযোগ করেন, তাঁরা ব্যক্তিগতভাবে ঋণ নিতে ব্যাংকে গেলে বলা হয়েছে, হিজড়াদের ঋণ দেওয়া যাবে না। হিজড়াদের নিয়ে কাজ করে বেসরকারি সংগঠন পুল। এর সভানেত্রী সুমনা সামাদ বলেন, ‘আসল ও নকল হিজড়াসংক্রান্ত জটিলতা দেখা দেওয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংক এ কর্মসূচি স্থগিত করেছে।’ এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক আবদুর রহিম বলেন, ‘বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখতে হবে, কী কারণে হিজড়ারা ঋণ সুবিধা নিতে পারেনি। ’সমাজকল্যাণমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন বলেন, হিজড়াদের জন্য সরকার বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। এখন আর তারা পরিচয়হীন নয়, তারা ভোট দিতে পারবে। তৃতীয় লিঙ্গের স্বীকৃতি পেয়েছে। সম্পত্তিতে হিজড়াদের উত্তরাধিকার প্রতিষ্ঠার আইন তৈরির পথে। বয়স্ক ভাতা বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। প্রশিক্ষণের পর তারা যাতে কাজ পায় তার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মেজবাহ কামাল মনে করেন, হিজড়াদের জন্য আবাসন একটি বড় সমস্যা, তাদের কেউ বাড়ি ভাড়া দিতে চায় না। সরকার হিজড়াদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার ভালো সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তবে প্রশিক্ষণের পর তা প্রয়োগ করে অর্থ উপার্জনের ক্ষেত্র না থাকলে প্রশিক্ষণ অর্থহীন হয়ে পড়ে।