জেগে রইল আশা

সংসদ ভেঙে নির্বাচন দেওয়াসহ জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট উত্থাপিত নির্বাচনকালীন সরকারের একটি রূপরেখা গতকাল বুধবারের দ্বিতীয় দফা সংলাপে সরকারপক্ষ নাকচ করে দিয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও দ্বিতীয় দিনের সংলাপ পুরোপুরি সফল হয়নি, এ কথা বলতে চায় না কোনো পক্ষ। সব পক্ষই মনে করছে, সময় এখনো ফুরিয়ে যায়নি। বরং সংলাপের মধ্য দিয়ে যে রাজনৈতিক স্বস্তির সুবাতাস উঠেছিল দেশে, সেই স্বস্তি স্থায়ী হওয়ার আশাবাদ জেগে রইল দ্বিতীয় দফায়ও। কারণ ঐক্যফ্রন্ট আবারও তাদের দাবি নিয়ে আলোচনা চেয়েছে। আওয়ামী লীগও বলেছে, সংলাপ শেষ হলেও আলোচনা হতে পারে।

নির্বাচনকালীন সরকার প্রশ্নে ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে ড. কামাল হোসেনের উত্থাপিত প্রস্তাব গতকাল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, সংবিধানের বাইরে তিনি যেতে পারবেন না। সংসদও আগে ভাঙা সম্ভব নয়। সরকার পদত্যাগও করবে না বলে তিনি সাফ জানিয়ে দেন। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জামিনের দাবি উত্থাপন করে ঐক্যফ্রন্ট নেতারা বলেন, সরকারপক্ষ আদালতে বিরোধিতা না করলেই তাঁর জামিন সম্ভব। এটি আদালতের বিষয় বলে প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন। তবে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সংলাপ-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘তিনি যদি আপিল করেন, আদালত যদি তাঁকে জামিনে মুক্তি দেন, আমাদের আপত্তি নেই।’

ঐক্যফ্রন্ট মূলত পঞ্চদশ সংশোধনীর মধ্য দিয়ে বাতিল হওয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার আদলেই একজন প্রধান উপদেষ্টাসহ ১০ সদস্যবিশিষ্ট উপদেষ্টা কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেয়। আর ওই প্রস্তাব কার্যকর হওয়ার অর্থ শেখ হাসিনা আর প্রধানমন্ত্রী থাকবেন না।

জানা গেছে, উত্থাপিত ওই প্রস্তাব নিয়ে পরে আলোচনা হয়। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সংবিধানের বাইরে সরকার গঠিত হলে তৃতীয় কোনো শক্তি ঢুকে পড়তে পারে। এ প্রসঙ্গে তিনি বিগত এক-এগারো সরকারের কথা স্মরণ করেন। এমন অবস্থায় ঐক্যফ্রন্টের নেতারা প্রধানমন্ত্রীকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, ‘আপনি ২০০৮ সালে ক্ষমতায় আসার আগে নির্বাচনী ইশতেহারে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের কথা বলেননি। অথচ পরে ক্ষমতায় এসে বাতিল করে দিলেন।’ এ ছাড়া ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের পরে সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে নির্বাচন করার কথা ছিল, সংলাপে এ কথাও উল্লেখ করেন ড. কামালসহ ঐক্যফ্রন্টের নেতারা। তবে প্রধানমন্ত্রী সংবিধানের বাইরে না যাওয়ার প্রশ্নে অনড় থাকেন। তিনি বলেন, ‘আপনারা নির্বাচনে আসুন; সুষ্ঠু নির্বাচন করে আমি দেখিয়ে দেব।’ তিনি বলেন, ‘আমি আমার দেশের জনগণের সঙ্গে প্রতারণামূলক কোনো অভিসন্ধি নিয়ে কাজ করি না। জনগণ ভোট দিলে থাকব। আপনাদেরকে ভোট দিলে আপনারা জিতবেন।’

তবে ঐক্যফ্রন্টের নেতারা বলেন, ন্যূনতম একটি আস্থার পরিবেশ তৈরি না হলে কী করে নির্বাচনে যাওয়া সম্ভব? সংলাপে নির্বাচনের তফসিল পিছিয়ে দেওয়ার দাবি জানালে প্রধানমন্ত্রী তাও নাকচ করে দেন। ঐক্যফ্রন্ট নেতারা বলেন, তফসিল ঘোষণা করেও পরে তা পেছানোর ইতিহাস এ দেশে আছে।

দ্বিতীয় দফা সংলাপ গতকাল সকালে গণভবনে অনুষ্ঠিত হয়। এতে আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১১ জন এবং ড. কামাল হোসেনসহ ঐক্যফ্রন্টের ১১ নেতা অংশ নেন।

গত ১ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে প্রথম সংলাপে সাত দফা প্রস্তাব উত্থাপন করে ঐক্যফন্ট; যার মধ্যে সংসদ ভেঙে দিয়ে নির্বাচনসহ বর্তমান সরকারের পদত্যাগ, খালেদা জিয়ার মুক্তি এবং নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনসহ আরো দাবি ছিল। আর গতকালের সংলাপে নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা দেয় ঐক্যফ্রন্ট।

সংলাপ শেষে নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না কালের কণ্ঠকে বলেন, সংলাপে এবারও সমাধান আসেনি। আলোচনা মনঃপূত হয়নি।

গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসিন মন্টু কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আলোচনা যাতে শেষ না হয়ে যায় সেটি আমরা বলে এসেছি। কিন্তু ওনারা বলেছেন সব কিছু হবে সংবিধান সমুন্নত রেখে। তো আমরা বলেছি, সংবিধান সমুন্নত রাখার জন্যই নির্বাচনটা করে ফেলবেন!’ তিনি বলেন, ‘বল এখন ওনাদের কোর্টে। তাঁদের ওপরই নির্ভর করছে, কী হবে।’

গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি সুব্রত চৌধুরী বলেন, ‘সংলাপ থেকে কী পেয়েছি, সেটি সরকার বলুক। আমরা তো লিখিত প্রস্তাব দিয়ে এসেছি। নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা দিয়ে এসেছি। আমরা শান্তিপূর্ণ নির্বাচন ও সমঝোতা চাই। প্রস্তাবগুলো উত্থাপন করে তা বিবেচনার জন্য বলে এসেছি। আমরা রাজপথে আছি, রাজপথেই থাকব।’ পরে আবার বসা যায়—এমন আশ্বাস পাওয়া গেছে বলেও জানান তিনি।

ঐক্যফ্রন্টের প্রস্তাবে যা আছে

নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের রূপরেখা শিরোনামে দেওয়া প্রস্তাবে চারটি উপশিরোনামে নিজেদের দাবিগুলো গতকাল উপস্থাপন করে ঐক্যফ্রন্ট। এতে বলা হয়েছে :

১. নির্বাচনের আগে সংসদ ভেঙে দেওয়া : সংসদ ভেঙে দেওয়া সংক্রান্ত পরিস্থিতি ও বিধানগুলো সংবিধানের বিভিন্ন অনুচ্ছেদে বিবৃত আছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ এবং বিভিন্ন দেশে প্রতিষ্ঠিত সাংবিধানিক প্রথায়ও সংসদের মেয়াদপূর্তির পূর্বে সংসদ ভেঙে দেওয়ার প্রচুর নজির রয়েছে। বাংলাদেশেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই মেয়াদপূর্তির পূর্বেই সংসদ ভেঙে দেওয়া হয়েছিল। বিদ্যমান সাংবিধানিক বিধান ও প্রথার আলোকে বিশেষ করে ১২৩(৩)(খ)-এর আলোকে প্রধানমন্ত্রী নভেম্বরের শেষে অথবা ডিসেম্বর মাসে রাষ্ট্রপতিকে বর্তমান সংসদ ভেঙে দেওয়ার পরামর্শ দিতে পারেন এবং সে অনুযায়ী সংসদ ভেঙে দেওয়া পুরোপুরি সংবিধানসম্মত হবে।

অনুচ্ছেদ ১২৩(৩)(খ) অনুযায়ী উল্লিখিত পন্থায় সংসদ ভেঙে দেওয়ার তারিখ থেকে পরবর্তী নব্বই দিনের মধ্যে নির্বাচন কমিশন একাদশ সংসদ নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণ করবে। সে ক্ষেত্রে সংসদ ভেঙে দেওয়ার তারিখ অনুযায়ী একাদশ সংসদ নির্বাচন ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারির শেষে বা মার্চে অনুষ্ঠিত হতে পারে। বিভিন্ন দেশের সাংবিধানিক রীতি অনুসারে সংসদ ভেঙে দেওয়া ও নির্বাচন অনুষ্ঠানের মধ্যে প্রায় ৪৫ দিন ব্যবধান থাকা বাঞ্ছনীয়।

এভাবে সংসদ ভেঙে দিলে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সব দল ও প্রার্থীর জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরির একটি বড় শর্ত পূরণ হবে।

২. নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন : বর্তমান নির্বাচন কমিশন বিগত ২০ মাসে অনেক স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজন করলেও জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারেনি। বর্তমান নির্বাচন কমিশনের দক্ষতা, সামর্থ্য ও নিরপেক্ষতা সম্পর্কে তাই বিভিন্ন প্রশ্ন রয়েছে। এর দায়দায়িত্ব মূলত প্রধান নির্বাচন কমিশনারের। তিনি নিজেই আগামী সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠানে তাঁর সংশয় ব্যক্ত করেছেন। এ অবস্থায় সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ ও অংশীদারিমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অন্তত আংশিক পুনর্গঠন অত্যাবশ্যক। এ জন্য নির্বাচন কমিশনের প্রধান হিসেবে প্রধান নির্বাচন কমিশনার সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১১৮(৬) অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির কাছে তাঁদের পদত্যাগপত্রের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন থেকে সরে যেতে পারেন। প্রধান নির্বাচন কমিশনার পদে রাজনৈতিক দলগুলোর আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতার ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতি নতুন কাউকে নিয়োগ করতে পারেন।

সমঝোতার মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনে নতুন সচিবও নিয়োগ করা প্রয়োজন। স্বরাষ্ট্র অথবা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন সচিব পর্যায়ের গ্রহণযোগ্য কোনো কর্মকর্তাকে অথবা প্রয়োজনবোধে সম্প্রতি অবসরপ্রাপ্ত নিরপেক্ষ ও দক্ষ কর্মকর্তাকে চুক্তিভিত্তিক এই পদে নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে।

৩. নির্বাচনের লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড :

(ক) খালেদা জিয়ার মুক্তি : খালেদা জিয়াসহ অন্য রাজনৈতিক নেতাদের অবিলম্বে অন্তত জামিনে মুক্তি দিতে হবে। অ্যাটর্নি জেনারেল, পিপি এবং অন্যান্য সরকারি আইনজীবী জামিনের বিরোধিতা করবেন না।

(খ) নতুন মামলা দায়ের না করা : সংসদ ভেঙে দেওয়ার পর কম্পিউটার সিস্টেমে অনুপ্রবেশ ও হ্যাকিং স্পেসজনিত তথ্য-প্রযুক্তিগত অপরাধ ব্যতীত বাক্ ও মত প্রকাশের ওপর আরোপিত বিধিনিষেধসংক্রান্ত অপরাধগুলোর ব্যাপারে নির্বাচনকালীন সময়ে (তফসিল ঘোষণা থেকে ফলাফল প্রকাশ) মামলা দায়ের করা যাবে না।

(গ) জামিনের বিরোধিতা না করা : গত তিন মাসে খুন বা ধর্ষণ ব্যতীত যেসব মামলায় দশ বা ততোধিক ব্যক্তি এবং/অজ্ঞতানামা বহুসংখ্যক ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে সেসব মামলায় এবং বিএনপি ও অন্যান্য প্রধান রাজনৈতিক দলের যেকোনো পর্যায়ের পদধারী নেতাদের বিরুদ্ধে যেসব মামলা করা হয়েছে, নির্বাচনকালে সরকার সেসব মামলায় জামিনের আবেদনে বিরোধিতা করবে না।

সরকার অবিলম্বে হয়রানিমূলক মামলাগুলো প্রত্যাহার করার কথাও বিবেচনা করবে। এ ছাড়া তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন, ২০০৬-এর ৫৭ ধারায় বর্তমানে অভিযুক্ত ও কারাগারে থাকা ব্যক্তিদের জামিনের ব্যাপারে সরকার বিরোধিতা করবে না।

(ঘ) মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা : সভা-সমিতির অধিকার—এখন থেকে নির্বাচনের ৪৮ ঘণ্টা আগ পর্যন্ত সব রাজনৈতিক দল ও নির্বাচনের প্রার্থীদের সভা-সমিতি, আলোচনা ও সংগঠনের স্বাধীনতা প্রয়োগের অবাধ সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।

বাক্স্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন থাকবে, সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৪৩ (খ)-এর প্রদত্ত গোপনীয়তার নিশ্চয়তা অনুযায়ী চিঠিপত্র, টেলিফোন ও মোবাইলের কথাবার্তা ফাঁস করার মতো অসাংবিধানিক কার্যক্রম থেকে বিরত থাকতে হবে এবং দোষী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

(ঙ) অন্যান্য : আগামী নির্বাচনের কোনো স্তরেই ইভিএম ব্যবহার করা যাবে না এবং নির্বাচনের সময়ে সেনাবাহিনীকে বিচারিক ক্ষমতাসহ নিরাপত্তা এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা সংক্রান্ত দায়িত্ব প্রদান করতে হবে। এ ছাড়া সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ এবং এতে সবার জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করার জন্য নির্বাচন কমিশনকে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে নিয়মিত পরামর্শ করতে হবে এবং সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।

৪. নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার :

(ক) রাষ্ট্রপতি রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে ঐকমত্যের ভিত্তিতে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সহায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ করবেন। রাষ্ট্রপতি সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য এবং কোনো রাজনৈতিক দল কিংবা এর অঙ্গসংগঠনের সদস্য কিংবা দল বা অঙ্গসংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন এবং আসন্ন সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হবেন না এমন একজন বিশিষ্ট ব্যক্তিকে প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ করবেন।

(খ) রাষ্ট্রপতি প্রধান উপদেষ্টার পরামর্শক্রমে ঐকমত্যের ভিত্তিতে ১০ জন উপদেষ্টা নিয়োগ করবেন। রাষ্ট্রপতি সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য এবং কোনো রাজনৈতিক দল কিংবা এর অঙ্গসংগঠনের সদস্য কিংবা দল বা অঙ্গসংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন এবং আসন্ন সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হবেন না এমন ব্যক্তিকে উপদেষ্টা করবেন।

(গ) প্রধান উপদেষ্টার নেতৃত্বে এবং অন্য ১০ জন উপদেষ্টার সমন্বয়ে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার গঠিত হবে।

(ঘ) এভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত প্রধান উপদেষ্টা সংবিধান প্রদত্ত প্রধানমন্ত্রীর পদমর্যাদা এবং পারিশ্রমিক ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা ভোগ করবেন। উপদেষ্টারা সংবিধান প্রদত্ত মন্ত্রীর পদমর্যাদা এবং পারিশ্রমিক ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা ভোগ করবেন।

(ঙ) রাষ্ট্রপতির উদ্দেশে নিজ হাতে লিখিত ও নিজের স্বাক্ষরযুক্ত পত্রের মাধ্যমে প্রধান উপদেষ্টা বা যেকোনো উপদেষ্টা পদত্যাগ করতে পারবেন।

(চ) নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার সংবিধানের ১২৩ (৩) (খ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জাতীয় সংসদ ভেঙে দেওয়ার অনধিক ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করবে।

ওবায়দুল কাদেরের ব্রিফিং : সংলাপ শেষে গতকাল দুপুরে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে ঐক্যফ্রন্টকে নির্বাচনে আসার অনুরোধ করেছেন। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, তিনি অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচন করে দেখিয়ে দেবেন এবং তিনি যা বলেছেন সেটাই সত্য। তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ফ্রি অ্যান্ড ফেয়ার ইলেকশন হবে, ক্রেডিবল ইলেকশন হবে, অ্যাকসেপ্টেবল ইলেকশন হবে এবং বিদেশি পর্যবেক্ষক যেকোনো বুথে যেতে পারে, যেকোনো নির্বাচন কেন্দ্রে যেতে পারে। তাঁরা (নির্বাচন পর্যবেক্ষক) যেভাবে চান, নির্বাচন কমিশন অ্যালাউ করলে আমাদের কোনো আপত্তি নেই।’

ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘ঐক্যফ্রন্টের নেতারা চাইছেন সংসদ ভেঙে দিয়ে পরবর্তী ৯০ দিনে নির্বাচন করার জন্য। নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড, বিদেশি পর্যবেক্ষক, রাজবন্দিদের মুক্তির কথাও বলেছেন। এসব বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, এসব দাবি মেনে নিতে আমাদের কোনো আপত্তি নেই। শিডিউল ডিক্লিয়ারের পরে নির্বাচন কমিশন এগুলো করবে। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের ব্যাপারে আমরা সম্মত।’ তিনি বলেন, ‘মন্ত্রীরা নিজের এলাকায় জাতীয় পতাকা ব্যবহার করবেন না, সরকারি সুযোগ-সুবিধা নেবেন না, সার্কিট হাউস, সরকারি গাড়ি ব্যবহার করবেন না। কোনো প্রকার সরকারি ফ্যাসিলিটিস আমরা ব্যবহার করব না।’

ঐক্যফ্রন্টের ১০ সদস্যবিশিষ্ট নির্বাচনকালীন সরকারের দাবির বিষয়ে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘আমরা সংবিধানের বাইরে যাব না, এটা পরিষ্কার করে বলে দিয়েছি।’ অন্য এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমাদের দলনেতা শেখ হাসিনা পরিষ্কারভাবে তাঁদের বৈঠকে এবং পারসোনালি বলেছেন যে, আসুন, একটি অবাধ ও সুষ্ঠু, ফ্রি-ফেয়ার-নিউট্রাল ইলেকশন করতে চাই। নির্বাচন পিছিয়ে দিতে গিয়ে কোনো অপশক্তিকে ফাঁকফোকর দিয়ে অনুপ্রবেশের সুযোগ দেবেন না যেটা আপনাদের জন্য ক্ষতি ডেকে আনতে পারে, আমাদের সবার জন্য সর্বনাশ ডেকে আনতে পারে।’ তাঁরা যে সাত দফা দাবি দিয়েছেন, সাত দফার বেশির ভাগই মেনে নিতে নেত্রী সম্মত হয়েছেন। কিন্তু তাঁরা আজকে এমন কিছু বিষয় নিয়ে এসেছেন, যেটা আসলে নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়ার একটা বাহানা।

ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘সেনাবাহিনীর ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার নিয়ে তাঁরা যে কথা বলেছেন, এটা আমাদের দেশে হয় না। পৃথিবীর কোনো গণতান্ত্রিক দেশে এ ধরনের নিয়ম চালু নেই। তবে সেনাবাহিনী মোতায়েন থাকবে টাস্কফোর্স হিসেবে। লোকাল অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের সহায়তায় তারা যখনই, যেখানে চাইবে, সেখানে স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে নিয়োজিত থাকবে।’

খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়ে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘ঐক্যফ্রন্টের নেতারা খালেদা জিয়ার মুক্তির ব্যাপারে জামিন চেয়েছেন। আপনারাই (গণমাধ্যমকর্মীরা) প্যারল বানিয়েছেন। তাঁরা কিন্তু প্যারল বলেননি। খালেদা জিয়ার মামলা তো এই সরকার করেনি। এটা করেছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার। আদালত তাঁকে দণ্ড দিয়েছেন। তারা লিগ্যাল ব্যাটল করতে পারে। আদালত যদি তাঁকে জামিনে মুক্তি দেন আমাদের কোনো আপত্তি নেই।’ তিনি আরো বলেন, ‘কিছু কিছু প্রস্তাব আছে যেগুলো আমাদের মেনে নিতে আপত্তি নেই। নির্বাচনকালীন সরকারের জন্য তাঁরা তো প্রস্তাব দিয়ে বলছেন, এটা সংবিধানের মধ্যেই; কিন্তু বিষয়টি তো সংবিধানের বাইরে। বিরাট গ্যাপ আছে তাঁদের প্রস্তাবের মধ্যে। তার পরও যাওয়ার সময় তাঁরা নমনীয় বলেই মনে হয়েছে।’

বল এখন সরকারের কোর্টে : ড. কামাল সংলাপের পর গতকাল নিজের বেইলি রোডের বাসায় সংবাদ সম্মেলনে ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেন বলেছেন, ‘সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছি, করছি, করে যাব।’ তিনি বলেন, দেশে একটা স্থিতিশীল অবস্থা, একটা শান্তিপূর্ণ অবস্থার মধ্যে সব কিছু হোক। দায়িত্ব তো সরকারের। বল এখন সরকারের কোর্টে।’

দুই দফা সংলাপে বসার জন্য প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে ড. কামাল বলেন, ‘আজকের সংলাপে আমরা আমাদের সাত দফা দাবি নিয়ে সীমিত পরিসরে আলোচনা অব্যাহত রাখার প্রস্তাব করেছি।’

তিনি বলেন, সংলাপে সারা দেশে হাজার হাজার রাজনৈতিক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে যেসব মিথ্যা ও গায়েবি মামলা করা হয়েছে সেগুলো প্রত্যাহার এবং ভবিষ্যতে আর কোনো গায়েবি ও হয়রানিমূলক মামলা দায়ের হবে না, ঐক্যফ্রন্ট নেতাদের গ্রেপ্তার করা হবে না বলে প্রধানমন্ত্রী আশ্বাস দিয়েছেন।

খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়ে কী আলোচনা হয়েছে—এই প্রশ্নের জবাবে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘সাত দফার প্রথম দফাই ছিল খালেদা জিয়ার মুক্তি, সংসদ ভেঙে দেওয়া, নির্বাচনকালীন সরকার গঠন ও নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন। খালেদা জিয়ার মুক্তির ব্যাপারে অবশ্যই আলোচনা হয়েছে। আমরা জোর দিয়ে বলেছি, উনি তো আইনগতভাবে মুক্তি পাওয়ার যোগ্য, জামিন পাওয়ার যোগ্য।’ খালেদা জিয়ার প্যারলের বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘এই ধরনের কোনো প্রস্তাবই আমরা দিইনি। সেই বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়নি।’

বৃহস্পতিবার একাদশ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হলে ফ্রন্টের অবস্থান কী হবে জানতে চাইলে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘কাল যদি তফসিল ঘোষণা করে, আমরা নির্বাচন কমিশন অভিমুখে পদযাত্রা করব। আমরা তো আন্দোলনেই আছি।’

বর্তমান সংকট নিরসন সংলাপে সম্ভব কি না প্রশ্ন করা হলে ফ্রন্টের এই মুখপাত্র বলেন, ‘আমরা সব সময় সংলাপকে আন্দোলনের অংশ হিসেবে নিয়েছি। আমরা এখনো বিশ্বাস করি, আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান হওয়া উচিত। সরকার যদি সেই পথে না আসে, সরকার যদি আলোচনার মাধ্যমে একটা জায়গায় পৌঁছাতে না চায়, এর দায়-দায়িত্ব তাদের ওপরই বর্তাবে।’

নির্বাচনকালীন সরকারের বিষয়ে সংলাপ শেষে ওবায়দুল কাদেরের দেওয়া বক্তব্যের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ‘আমরা বলেছিলাম, সংসদ ভেঙে দিতে হবে। এর ৯০ দিন পরেই তো নির্বাচন হবে। সংসদ ভেঙে দেওয়াটা সংবিধানের অন্তর্গত এবং এখনই এটি সংবিধানে আছে। একই সঙ্গে দুটি সংসদ থাকবে, এটা তো কোনো নিয়মই হতে পারে না। উনারা যদি বলেন এটা সংবিধানে নেই, তাহলে উনারা ভুল বলেছেন।’ মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আমরা এ বিষয়ে প্রস্তাব করেছি। তারা (সরকার) বলেছে যে আলোচনা হতে পারে।’

নির্বাচনকালীন সরকারের বিষয়ে এখনো সরকার তার অবস্থানে অনড়, তাহলে আপনারা কী আশা করছেন প্রশ্ন করলে ফখরুল বলেন, ‘এটা সরকার যদি না মানে তাহলে আন্দোলনের মাধ্যমে আমরা তা আদায় করব।’

এই দুই দফা সংলাপে আপনারা কী পেলেন প্রশ্নে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘পাওয়ার ব্যাপারটা রিলেটিভ ব্যাপার। আমরা আমাদের দাবিদাওয়া নিয়ে সরকারের কাছে গেছি। তারা বলেছে, ভবিষ্যতে তারা আলোচনা করে দেখতে পারে, সুযোগ আছে। আমরা আমাদের দাবি নিয়ে জনগণের কাছে যাচ্ছি। জনগণকে উদ্বুদ্ধ করে এই দাবি আদায় করব।’

এদিকে গত রাতে গণভবনে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘আমরা দলের অনেকেই সংলাপের বিরুদ্ধে ছিলাম। ১৫ ও ২১ আগস্টের কুশীলবদের সঙ্গে আলোচনা করতে চাইনি। নেত্রী চেয়েছেন বলেই আমরা সার্বিক সহযোগিতা করেছি।’ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলন স্থগিতের কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, জাতীয় সংসদের তফসিল ঘোষণা হবে বলে আগামীকালের সংবাদ সম্মেলন স্থগিত করেছেন প্রধানমন্ত্রী। ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনে আসবে না, এটা আমরা বিশ্বাস করি না।’

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সংলাপ শেষে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেনের বেইলি রোডের বাসায় এসে বৈঠক করেন অন্য নেতারা। এক ঘণ্টা বৈঠক শেষে এই সংবাদ সম্মেলনে আসেন তাঁরা।

2018-11-08T09:59:12+00:00November 8th, 2018|বাংলাদেশ|
Advertisment ad adsense adlogger