শেখ হাসিনাকে সোনিয়া গান্ধীর অভিনন্দন

উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষা করাই নতুন সরকারের আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ।
গত দুই মেয়াদে নেয়া মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও মাদক নিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্ন খাতের অগ্রগতি ধরে রাখতে হবে নতুন সরকারকে।

অন্যথায় লক্ষ্য অর্জনের ধারা অব্যাহত রাখা কঠিন হবে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ ও রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, বড় জয় ধরে রাখাও কঠিন। এ জন্য অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা জরুরি। এজন্য সরকারকে সমন্বিতভাবে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণেরও সুপারিশ করেছেন তারা।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুর জয়লাভ করেছে আওয়ামী লীগ। খুব শিগগিরই দলটি সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। দ্রুতই মাঠে নামবে নতুন সরকার।

এদিকে নতুন সরকারের চ্যালেঞ্জ প্রসঙ্গে বর্তমান অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা এবং আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা। তার মতে, ‘আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশের অর্থনীতি অসাধ্য সাধন করবে। সরকারের ধারাবাহিকতা থাকার কারণে আশা করছি, এ সময় দেশ দারিদ্র্যমুক্ত হবে।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা এবিএম মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম মঙ্গলবার যুগান্তরকে বলেন, নতুন সরকারের নির্বাচনের ইশতেহারে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ১০ শতাংশে নেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে।

প্রবৃদ্ধির এ লক্ষ্য অর্জন করতে বিনিয়োগ জিডিপির আনুপাতিক হারের ৪০ শতাংশ হতে হবে। বর্তমানে এটা ৩১ দশমিক ২ শতাংশে আছে। এক্ষেত্রে বেসরকারি বিনিয়োগ আনুপাতিক হারে বাড়াতে হবে। তিনি বলেন, বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে কিছু চ্যালেঞ্জ আছে।

যেমন পরিবহন, বন্দর, গ্যাস, বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করা। এর বাইরে সার্বিকভাবে সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। উল্লেখিত কাজগুলো সমন্বিতভাবে করতে হবে। তিনি আরও বলেন, আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হচ্ছে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা।

কারণ উচ্চশিক্ষিতের মধ্যে বড় একটি অংশ বেকার। এজন্য বিনিয়োগ বাড়ানোর সঙ্গে বিদ্যমান শিক্ষা ব্যবস্থাকে বাজারমুখী করে তুলতে হবে। মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, দারিদ্র্য বিমোচন বার্ষিক গড় হার বাড়াতে হবে। কারণ কয়েক বছর ধরে তা কমে যাচ্ছে।

এ জন্য সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীতে বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি এর অপব্যবহার রোধ করতে হবে। তার মতে, এসব কাজ বাস্তবায়নে সমন্বিতভাবে চেষ্টা করতে হবে।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের মঙ্গলবার যুগান্তরকে বলেন, নতুন সরকারের চ্যালেঞ্জ একটাই- যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিজয় পেয়েছে তা বাস্তবায়ন করা। ইশতেহারে জনগণের কাছে যে ওয়াদাগুলো করেছেন সেটার বাস্তবায়নই আমাদের বড় চ্যালেঞ্জ।

আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারের ৬নং অঙ্গীকারটি হচ্ছে ‘সন্ত্রাস, সাম্প্রদায়িকতা, জঙ্গিবাদ ও মাদক নির্মূল।’ এটি সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ। এদিকে প্রধানমন্ত্রী ইতিমধ্যে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছেন মাদকের ব্যাপারে। এক্ষেত্রে সফলতা এলেও ঘুষ-দুর্নীতি এখনও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।

তৃতীয় মেয়াদে এ সরকার দুর্নীতি নির্মূলের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

এদিকে অর্থনৈতিকভাবে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ দেখা দেবে নতুন সরকারের জন্য। এ প্রসঙ্গে ঢাকায় নিযুক্ত বিশ্বব্যাংকের লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন যুগান্তরকে বলেন, স্বল্পমেয়াদে ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার পদক্ষেপ নিতে হবে।

এক্ষেত্রে ইচ্ছাকৃত বড় মাপের খেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া, ঋণখেলাপিদের মদদদাতা প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। এছাড়া জাতীয় নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক বিবেচনায় নেয়া প্রকল্পগুলোকে এডিপিতে যৌক্তিকরণ করতে হবে।

বিশেষ করে এসডিজির সঙ্গে সঙ্গতি রেখে প্রকল্পগুলোর অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হবে। আর মেগা প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন গতি বাড়িয়ে নির্দিষ্ট মেয়াদের মধ্যেই শেষ করার ব্যবস্থা নিতে হবে।

এ অর্থনীতিবিদের মতে, নতুন সরকারকে বিনিয়োগের বাধা দূর করতে ইতিমধ্যেই নেয়া ডুইং বিজনেস পরিবেশ উন্নয়নে পদক্ষেপগুলো ত্বরান্বিত করতে হবে। জনকল্যাণ ও উৎপাদনের জন্য প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়াতে হবে। জনগণের কাছে সেবা পৌঁছাতে প্রশাসনকে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ও বিআইডিএসের সাবেক ডিজি এমকে মুজেরি যুগান্তরকে বলেন, নির্বাচনের সময় অর্থনীতিতে এক ধরনের অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে তা বেশি হয়।

এটি যত স্বল্পই হোক তা দূর করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে এখনই। যাতে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে শঙ্কা দূর হয় এবং বিনিয়োগে তারা আগ্রহী হন। এছাড়া নির্বাচনীয় ইশতেহারে অনেক প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে।

তা বাস্তবায়নে মধ্যমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। এতে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন সহজ হবে। মেগা প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে দ্রুততা আনতে হবে। অন্যথায় এর সুফল পেতেও দেরি হবে। আর এসব প্রকল্পের ব্যয়ও অনেক বেড়ে যাবে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক যুগান্তরকে বলেন, যত বড় বিজয় তত বড় দায়িত্ব। দেশের মানুষ অনেক বড় দায়িত্ব দিয়ে টানা তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতায় এনেছে।

নতুন সরকারের জন্য চলমান মেগা প্রকল্পগুলো সম্পন্ন করা, দুর্নীতি নির্মূল করা ও দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ সৃষ্টি করা চ্যালেঞ্জ।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ড. নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ যুগান্তরকে বলেন, এত বড় বিজয়; এটা ধরে রাখাই সরকারের জন্য একটা বড় চ্যালেঞ্জ। তবে মাদক নির্মূল, জঙ্গিবাদ ও দুর্নীতি দমনও সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গণতন্ত্রের বিকাশের কথাও বলেছেন অনেকে।

এক্ষেত্রে তারা বলছেন, তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত সরকারে ও দলে গণতন্ত্রচর্চা সৃষ্টি করতে হবে। সবার সমঅধিকার প্রতিষ্ঠায় গণতন্ত্র বিকাশের বিকল্প নেই। বর্তমান সরকারের অন্যতম লক্ষ্য ২০২১ সালের মধ্যে দেশকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করা। এজন্য দারিদ্র্যের হ্রাস করা জরুরি। নির্বাচনী ইশতেহারের ৯নং অঙ্গীকার দারিদ্র্য হ্রাসের কথা বলা হয়েছে। এজন্য বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের অনুন্নত এলাকায় দারিদ্র্য হ্রাসের বিশেষ প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে, যা সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।