ক্লাস চলছে। ক্লাসরুমের দেয়ালটা কাঠ আর কাচের। স্বচ্ছ কাচের ওপাশে দেখা গেল, কয়েকজন চোখ মুছছেন। একটু পর আবার তাঁদের মুখে হাসি। হচ্ছেটা কী? ক্লাস শেষ হওয়ার পর একজন বললেন, ‘আর্ট অব লিভিং ক্লাস করছিলাম তো, তাই।’ ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির পাঠক্রমেরই একটি অংশ এই ‘আর্ট অব লিভিং’ ক্লাস। বাস্তব উদাহরণ দিয়ে শিক্ষকেরা এই ক্লাসে এমনভাবে পড়ান, অনেক শিক্ষার্থীই নাকি আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। নীতি-নৈতিকতা, মূল্যবোধ, আচার-আচরণ থেকে শুরু করে পারিবারিক বা প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিত, সবকিছুই শেখানো হয় এই বিষয়ের ক্লাসে। কারণ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির চেয়ারম্যান সবুর খান বললেন, তাঁদের লক্ষ্য হলো শিক্ষার্থীদের মানুষের মতো মানুষ বানানো; নম্বর ছেপে সনদ ধরিয়ে দেওয়া নয়। আশুলিয়ার দত্তপাড়ায় ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির বিশাল সবুজ ক্যাম্পাস। ধানমন্ডি ও উত্তরার ক্যাম্পাসেও চলে পাঠদানের কার্যক্রম। শেষ হিসাব অনুযায়ী মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২০ হাজার ছাড়িয়েছে। স্বপ্ন নিয়ের এবারের আয়োজন ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি নিয়ে। পড়ালেখায় আধুনিকতাএখানে পাঁচটি অনুষদের আওতায় আছে মোট ২৫টি বিভাগ। ভর্তি তথ্যকেন্দ্র থেকে জানা গেল, বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি অনুষদের অন্তর্ভুক্ত কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল (সিএসই) বিভাগে সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী ভর্তি হয়। বাকি চারটি অনুষদ হচ্ছে ব্যবসা ও অর্থনীতি, মানবিক ও সমাজবিজ্ঞান, প্রকৌশল এবং ‘অ্যালাইড হেলথ সায়েন্সেস’। স্নাতকের পর ১৩টি বিষয়ে স্নাতকোত্তর করার সুযোগ আছে। সফটওয়্যার বিভাগের নওরীন নুহা বলেন, ‘সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের পড়ানোর জন্য শিক্ষকেরা “গুগল ক্লাসরুম” ব্যবহার করেন। গুগল ক্লাসরুমে শিক্ষকেরা লেকচারশিটগুলো আপলোড করে দেন। কিছু বুঝতে অসুবিধা হলে বাসায় বসেও আমরা লেকচারগুলো দেখে নিতে পারি। কখনো কখনো ইউটিউবের ভিডিও দেখিয়ে আমাদের শেখানো হয়।’ গতানুগতিক মুখস্থ করার ধারা থেকে বের হয়ে এসে কীভাবে প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে জ্ঞান অর্জন করা যায়, সেটার চর্চা হয় ক্লাসরুমে। শিক্ষার্থীর আচরণ ও পরীক্ষার ফলাফলের ওপর নির্ভর করে ভর্তির এক বছর পর বিনা মূল্যে তাঁদের ল্যাপটপ দেওয়া হয়। প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য রয়েছে একজন উপদেষ্টা-শিক্ষক। পড়াশোনা, এমনকি ব্যক্তিগত সমস্যাও এই শিক্ষকের সঙ্গে আলোচনা করে পরামর্শ নেওয়া যায়। মনের সুস্থতার দিকেও জোর দেওয়া হয় এই বিশ্ববিদ্যালয়ে। ক্যাম্পাসে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার সুযোগ তো আছেই, আছেন মনোবিদও। পরীক্ষার ফল ভালো না হলে শিক্ষার্থী যেন ভেঙে না পড়েন, মনোবিদ সেদিকে নজর রাখেন। বৃত্তি নিয়ে দেশের বাইরে ‘এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম’-এ যাচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। সবুর খান বললেন, ‘বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ২২৬টি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে আমরা চুক্তি করেছি। আমাদের শিক্ষার্থী বৃত্তি নিয়ে নির্ধারিত সময়ের জন্য সেখান থেকে পড়াশোনা করে আসে। আবার ভিনদেশি এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও বিদেশি শিক্ষার্থী বৃত্তি নিয়ে আমাদের এখানে পড়তে আসে।’ প্রতিভা বিকাশের সংগঠন বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেকগুলো বিভাগভিত্তিক ক্লাবের পাশাপাশি রয়েছে বেশ কিছু কেন্দ্রীয় সাংস্কৃতিক সংগঠন। বিতর্ক, ইংরেজি সাহিত্য, আলোকচিত্র, সামাজিক কার্যক্রম, পরিবেশ, স্বাস্থ্যসহ নানা বিষয় নিয়ে কাজ করছে শিক্ষার্থীদের মোট ২৮টি সংগঠন। ক্যাম্পাসে, দেশে ও দেশের বাইরে এই সংগঠনগুলোর সদস্যরা বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছেন। পুরস্কারও আসছে। অনলাইনভিত্তিক ক্যাম্পাস রেডিও ও ক্যাম্পাস টিভির অনুষ্ঠানে রয়েছে শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। বিশ্ববিদ্যালয়ের যেকোনো অনুষ্ঠান সরাসরি সম্প্রচার করে ক্যাম্পাস টিভি। শিক্ষার্থীদের তৈরি অন্যান্য অনুষ্ঠান তো আছেই। সাবেক শিক্ষার্থীদের নিয়ে নিয়মিত আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ক্লাবগুলো, যেন বর্তমান শিক্ষার্থীরা তাদের সঙ্গে পরিচিত হয়ে কর্মক্ষেত্রে সুযোগ তৈরি করতে পারেন। ইলেকট্রনিকস অ্যান্ড ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী অমিত সাহা বললেন, ‘দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে, সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে ক্লাবগুলোই বিশ্ববিদ্যালয়ের পতাকা বহন করে।’ সারা বছর সরব ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে সারা বছর বিভিন্ন আয়োজন লেগেই থাকে। অ্যাসাইনমেন্ট ও প্রেজেন্টেশন-বিষয়ক কর্মশালা হয়। কীভাবে মঞ্চে দাঁড়িয়ে অনেক মানুষের সামনে কথা বলতে হয়, সেটি শেখানোর জন্য ‘স্পিক আউট’ নামে একটি সংগঠন প্রতি সপ্তাহে সেশন আয়োজন করে। বিভিন্ন কোম্পানির মানব সম্পদ বা বিপণন বিভাগের কর্মীরা এসে ক্লাস নেন, যেন শিক্ষার্থীরা বর্তমান সময়ের কাজের ধরন সম্পর্কে জানতে পারেন। ‘লেকচার সিরিজ’ নামে একটি আয়োজন করা হয় নিয়মিত। এই আয়োজনে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী বা চেয়ারম্যানরা নিজেদের গল্প শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নেন। বিবিএ বিভাগের ফারুক হোসাইন বললেন, সফল মানুষদের কাছ থেকে তাঁদের গল্প শুনে ভীষণ অনুপ্রাণিত হন তাঁরা। অন্য রকম একটি আয়োজনের খবর জানালেন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টুডেন্ট অ্যাফেয়ার্সের পরিচালক সৈয়দ মিজানুর রহমান। প্রতি সেমিস্টারে আয়োজন করা হয় ‘প্যারেন্টস ডে’, দিনটা অভিভাবকদের জন্য। ‘আর্ট অব লিভিং’ বিষয়ের আওতাধীন এই আয়োজনে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের মতামত, অনুভূতি নিয়ে আলোচনা করা হয়। আলোচনা শেষে শিক্ষার্থীরা বুঝতে পারেন, মা-বাবার কতটা কষ্টের আয়ে তাঁরা পড়াশোনা করছেন।
পড়ালেখার বাইরে আশুলিয়া ক্যাম্পাসে পা রাখলেই শিক্ষার্থীদের মন ভালো হয়ে যায়। বিশাল মাঠ, বুকভরে দম নেওয়ার সুবর্ণ সুযোগ। ক্যানটিন, মিলনায়তন, বারান্দা, সিঁড়িকোঠা, হোস্টেল চত্বর—আড্ডা জমে সর্বত্র। কোথাও আড্ডার সঙ্গে যোগ হয় গান কিংবা চায়ের কাপে চুমুক। শহুরে ক্যাম্পাসগুলোতেও আড্ডার জায়গা খুঁজে নিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। ধানমন্ডি ক্যাম্পাসে ক্লাস করেন সিএসই বিভাগের ছাত্রী দেবাঞ্জনা সাহা। বললেন, ‘ছাত্রজীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময়ই তো এটা। প্রিন্স প্লাজার গলি, কৃষ্ণচূড়াতলা, ধানমন্ডি লেক, রবীন্দ্রসরোবর…আশপাশের জায়গাগুলোতে আমরা দলবেঁধে বসি। প্রতিদিন কুইজ, অ্যাসাইনমেন্ট, প্রেজেন্টেশন, মিড, ফাইনালের চাপে এই আড্ডাগুলো আসলে মন ভালো করে দেয়।’
লক্ষ্য ও সাফল্ ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান সবুর খান বলেন, ‘আমাদের প্রথম লক্ষ্য ছিল প্রযুক্তির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা। সেটা আমরা পেরেছি। দ্বিতীয় লক্ষ্য ছিল দেশের বাইরে ড্যাফোডিলের সুনাম ছড়িয়ে দেওয়া। এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামের মাধ্যমে সেই লক্ষ্যপূরণে আমরা অনেকটাই সফল হয়েছি। তৃতীয় লক্ষ্য, পাস করার পরপরই শিক্ষার্থীদের চাকরি দেওয়া। আমরা এ জন্য শিক্ষানবিশ প্রকল্প চালু করেছি। আমাদের এখানেই যেন আমাদের শিক্ষার্থীদের চাকরি দেওয়া যায়। চতুর্থ লক্ষ্য হলো উদ্যোক্তা তৈরি করা। এটা এখন আমাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। চাকরি তাদের পেতে হবে না, তারা অন্যকে চাকরি দেবে। এ জন্য আমরা চালু করেছি এন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ বিভাগ।’প্রয়োজন দায়িত্ববোধ, যোগাযোগের দক্ষতা ও চিন্তার ক্ষমতা
ইউসুফ মাহবুবুল ইসলাম উপাচার্য, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি চাকরিক্ষেত্রে বা পেশাজীবনে প্রবেশ করার আগে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি নির্ভর করে তিনটি ভিত্তির ওপর। প্রথমত, শিক্ষার্থীদের চিন্তা করার ক্ষমতা দরকার। দ্বিতীয়ত, দরকার দায়িত্ববোধ। তৃতীয়ত, প্রয়োজন যোগাযোগের দক্ষতা। এই জিনিসগুলো পাঠ্যক্রমে নেই। কিন্তু ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি এ নিয়ে কাজ করছে। যেমন, আমাদের এখানে শিক্ষার্থীদের জন্য একটা কর্মশালা আয়োজন করানো হয়। শিরোনাম, ‘এমপ্লয়েবিলিটি ৩৬০’। কর্মাশালা শেষে তাঁদের দেওয়া হয় চাকরিক্ষেত্রে দক্ষতার সনদ। এই সনদের স্বীকৃতি দিচ্ছে ‘স্কটিশ কোয়ালিফিকেশন অথোরিটি’। আমাদের দেশের অভিভাবকদের বড় সমস্যা হলো তাঁরা সন্তানদের তথাকথিত কিছু বিষয়ের বাইরে পড়াশোনা করতে দিতে চান না। অনেকে বুঝতে চান না সন্তান যে বিষয়টা পড়ে মজা পাবে সেই বিষয়টাতেই ভালো ফল করতে পারবে, কর্মক্ষেত্রে সফল হবে। এই সমস্যার সমাধানে আমরা খুব শিগগিরই মালয়েশিয়ায় একটা ক্যাম্পের আয়োজন করতে যাচ্ছি। সেখানে আমাদের দেশের ও বিদেশের শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা থাকবেন। জানিয়ে রাখি, নিয়োগের পর আমাদের শিক্ষকদের বিশেষভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এসব কারণেই ড্যাফোডিল অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আলাদা।