দাবি আদায়ে অনড় শিক্ষকরা অনশনে অসুস্থ দুই শতাধিক

কনকনে শীতের মধ্যে টানা অনশনে প্রায় ২০০ জন অসুস্থ হয়ে পড়লেও জাতীয়করণের দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত্ম আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন ইবতেদায়ি মাদ্রাসার শিক্ষকরা। শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে বসলেও তার ‘আশ্বাসে’ সাড়া দেননি এই শিক্ষকরা। প্রধানমন্ত্রী বা অর্থমন্ত্রীর কাছ থেকে জাতীয়করণের ‘স্পষ্ট ঘোষণার’ অপেক্ষায় অনশন ভাঙেননি তারা। গত ১ জানুয়ারি জাতীয়করণের দাবিতে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে অবস্থান শুরম্ন করে বাংলাদেশ স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসা শিক্ষক সমিতি; যা আট দিন পর আমরণ অনশনে রূপ নেয়। শিক্ষক নেতারা জানিয়েছেন, সোমবার সকাল পর্যন্ত্ম টানা অনশনে অসুস্থ হয়ে চিকিৎসা নিতে হয়েছে প্রায় ২০০ জনকে, দুইজন আছেন হাসপাতালে। নিজের আট বছর বয়সী ছেলেকে নিয়ে প্রথম দিন থেকে সেখানে আছেন ভোলার রহিমা বেগম, চরফ্যাশন উপজেলার উত্তর মাদ্রাজ ওলিউদ্দিন ইবতেদায়ি মাদ্রাসায় ১৪ বছর ধরে পড়ান তিনি। শীতের রাতে ছেলেকে নিয়ে কষ্টের কথা প্রকাশ করলেও দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত্ম ঘরে ফিরবেন না বলে জানান তিনি। তার সঙ্গে আরও ১৩ জন নারী শিক্ষক আমরণ অনশনে আছেন। চরফ্যাশনের একটি কলেজ থেকে বিএ পাস করে শিক্ষকতায় আসা রহিমা বলেন, ‘গত ১৪ বছর ধরে আমি ছেলেমেয়েদের পড়াই, কিন্তু কোনো বেতন পাই না, ভাতা পাই না। আগে বই দেয়ার পাশাপাশি উপবৃত্তি দিত। এখন উপবৃত্তি দেয়াও বন্ধ।’ জাতীয়করণের আশ্বাস পেতে পেতে শিক্ষকরা এই পর্যায়ে ঠেকেছেন উলেস্নখ করে তিনি বলেন, ‘আমাদের দাবি জাতীয়করণ। বেতন না হওয়া পর্যন্ত্ম আমরা এখান থেকে যাব না।’ ৩৩ বছর ধরে প্রায় সাত হাজার ইবতেদায়ি মাদ্রাসার শিক্ষকরা ‘বেতন-ভাতা ছাড়াই’ শিক্ষার্থীদের পড়িয়ে যাচ্ছেন বলে দাবি অনশনকারী শিক্ষকদের। বেতন না পাওয়ায় শিক্ষকতার পাশাপাশি কৃষিকাজ করে ছয়জনের সংসার চালান জয়পুরহাটের শিক্ষক আবদুল মোমিন। আন্দোলনের শুরম্ন থেকেই স্বেচ্ছাসেবকের দায়িত্বও পালন করতে দেখা যায় জয়পুরহাটের কালাই উপজেলায় মাত্রাই স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসার এই শিক্ষককে। তিনি বলেন, ‘আমাদের মাদ্রাসার চারজন শিক্ষকের সবাই অনশনে এসেছি। রাতে কনকনে শীতে এ সময়ে ঘরের ভেতরে অবস্থান করতেও কষ্ট হয়, অথচ সে অবস্থায় আমরা এখানে আছি। তবুও কেউ যেন আমাদের কথা শুনছে না। ‘আগের দিন বৈঠকের পর বৈঠক হয়েছে, সমাধান তো কিছু হয়নি। আমরা বেতনের ঘোষণা না আসা পর্যন্ত্ম এখান থেকে যাব না।’ তিনি বলেন, ‘আমরা ছাত্রছাত্রীদের দিকে তাকিয়ে অনেক কষ্ট হলেও মাদ্রাসা ছেড়ে যাইনি। প্রয়োজনে চাষাবাদ করেছি, আলু আবাদ করে সংসার চালিয়েছি। আমরা শিক্ষকরা ঢাকায় এলেও আমার স্ত্রী, সভাপতির স্ত্রী ও সভাপতির মেয়ে মিলে মাদ্রাসা খোলা রেখেছে।’ এক হাজারের বেশি শিক্ষক আমরণ অনশনে অংশ নিচ্ছেন বলে জানান স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসা শিক্ষক সমিতির সভাপতি কাজী রম্নহুল আমিন চৌধুরী। লক্ষ্ণীপুর সদরের পূর্ব জামিরহাট স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসার এই প্রধান শিক্ষক বলেন, ‘শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক হলেও তিনি আমাদের আশ্বস্ত্ম করতে পারলেন না। আমরা বলেছি, আপনারা জাতীয়করণের ঘোষণা দিন, প্রয়োজনে ক্রমান্বয়ে সেটা বাস্ত্মবায়ন হোক। এক সাথে ১০ হাজার মাদ্রাসাকে জাতীয়করণ করে শিক্ষকদের বেতন দিতে বলি নাই আমরা। বলেছি, অর্থ সংকট থাকলে শর্তপূরণ সাপেক্ষে ক্রমান্বয়ে করতে পারেন সেটা। কিন্তু তারা ঘোষণা দিতে নারাজ।’ নিকাহ রেজিস্ট্রার হিসাবে কাজ করেন এবং প্রবাসী ছেলের আয়ে সংসার চলে জানিয়ে রম্নহুল আমিন বলেন, ‘শীতের মধ্যে না খেয়ে, না ঘুমিয়ে আমরা অনশনে আছি। ওষুধ দরকার, ওষুধ নাই, টয়লেটের দরকার, টয়লেট নাই। এই তীব্র শীত নিয়ে আমরা আছি, কিন্তু জাতীয়করণের ঘোষণা না পেলে এখান থেকে যাব না।’ রোববার আন্দোলনরত মাদ্রাসা শিক্ষকদের একটি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠক করে শিক্ষামন্ত্রী নুরম্নল ইসলাম নাহিদ তাদের দাবি প্রধানমন্ত্রীর কাছে তোলার আশ্বাস দেন। মন্ত্রী শিক্ষকদের ঘরে ফিরে যাওয়ার অনুরোধও করেন। এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের আমরণ অনশন শুরম্ন এদিকে বেসরকারি শিক্ষা জাতীয়করণের এক দফা দাবিতে এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা এবার আমরণ অনশন শুরম্ন করেছেন। বেসরকারি শিক্ষা জাতীয়করণ লিয়াজোঁ ফোরামের ডাকে সোমবার সকাল ১০টায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে এই অনশন শুরম্ন হয়। এর আগে গত ১০ জানুয়ারি থেকে লাগাতার অবস্থান কর্মসূচি পালন করে আসছিলেন এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা। তারা আগেই ঘোষণা দিয়েছিলেন, রোববারের মধ্যে দাবি পূরণ না হলে আজ থেকে আমরণ অনশন শুরম্ন করবেন। ফোরামের যুগ্ম আহ্‌বায়ক মতিউর রহমান বলেন, প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে দাবি পূরণের ঘোষণা না আসা পর্যন্ত্ম এই অনশন চলবে। তিনি জানান, এই অনশনে যোগ দিতে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আরও শিক্ষকেরা এখন পথে আছেন। অন্যদিকে, স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসা জাতীয়করণের দাবিতে ওই সব মাদ্রাসার শিক্ষকেরা সোমবার সপ্তম দিনের মতো আমরণ অনশন করছেন। স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসা শিক্ষক সমিতির মহাসচিব কাজী মোখলেছুর রহমান বলেন, এখন তারা জীবন বাজি রেখে হলেও কর্মসূচি চালিয়ে যাবেন। দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত্ম এই অনশন চলবে। আন্দোলনকারী শিক্ষকেরা জানিয়েছেন, এই অনশনে ১২ জন শিক্ষক নতুন করে অসুস্থ হয়েছেন। এই নিয়ে গত সাত দিনে মোট অসুস্থ শিক্ষকের সংখ্যা ১৭৭। অনেকে অনশনস্থলেই স্যালাইন নিয়ে শুয়ে আছেন। দুজনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

 

2018-01-16T12:27:08+00:00January 16th, 2018|শিক্ষা ও সংস্কৃতি|