নির্বাচনী বছরে শিক্ষক সমাজ তাদের দাবি দাওয়া আদায়ে একের পর এক আন্দোলনের পরিধি বাড়িয়ে চলেছেন। তবে এসব দাবি মানতে গেলে বাজেটের উপর যে চাপ পড়বে তা কুলিয়ে উঠা সরকারের জন্য রীতিমতো দুঃসাধ্য। অথচ শিক্ষকদের আন্দোলনের সঙ্গে দেশের প্রায় সব শ্রেণি-পেশার মানুষের পাশাপাশি সুশীল সমাজ ও সরকারেরও একটি অংশ সহানভূতিশীল। এ অবস্থায় শিক্ষক আন্দোলন, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সরকারের নেতিবাচক ভাবমূর্তি এবং আদালতের রায়ে ঢাকসু নির্বাচনের বাধ্যবাধকতাসহ বিভিন্ন বিষয় সরকারের জন্য নির্বাচনী বছরে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে বলেই মনে করছেন সংশিস্নষ্টরা।
আজ সারাদেশে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে জাতীয়করণের দাবিতে আন্দোলনে থাকা বৃহৎ চারটি শিক্ষক সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত বেসরকারি শিক্ষা জাতীয়করণ লিয়াঁজো ফোরাম। এছাড়া এদিন জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে বড় সমাবেশের প্রস্তুতিও নেয়া হয়েছে। পরিস্থিতি বুঝে আবারও নতুন কর্মসূচি আসবে বলে যায়যায়দিনকে নিশ্চিত করেছে লিয়াঁজো ফোরামের নেতারা। অনুমোদনপ্রাপ্ত বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির দাবি সরকার এরই মধ্যে মেনে নেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসার দাবি মেনে নেয়ার আশ্বাস দিয়েছে। তবে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের দাবিতে লিয়াঁজো ফোরামের নেতৃত্বে আমরণ অনশন কর্মসূচি চলমান থাকায় তা সরকারকে বেশ চাপে ফেলেছে। এমপিওভুক্তি ও ইবতেদায়িদের বিষয়ে সরকার ইতিবাচক হলেও বিপুল সংখ্যক বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের বিষয়টি সরকারের জন্য বেশ বিব্রতকরও বটে। এর জন্য যে বিপুল অর্থের প্রয়োজন তাও রাষ্ট্রের পক্ষে বহন করা কষ্টসাধ্য বলে মনে করছে সংশিস্নষ্ট মহল। কিন্তু আন্দোলনে থাকা শিক্ষকরা বলছেন, সরকার অচিরেই তাদের দাবি দাওয়া মেনে না নিলে তারা আরো কঠোর আন্দোলনে যাবেন। যার অংশ হিসেবে প্রয়োজন হলে সব শিক্ষকের পাশাপাশি নিজেদের স্ত্রী-সন্ত্মানদেরও ঢাকায় আনার ঘোষণা দিয়েছেন তারা। যে কোনো সময় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ধর্মঘট লাগাতারও করতে পারেন তারা। গত বুধবার প্রধানমন্ত্রী জাতীয় সংসদে এ সম্পর্কে বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, নীতিমালার আলোকে আগামী বাজেটে বেসরকারি স্কুল এমপিওভুক্তি ও জাতীয়করণ করা হবে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সংখ্যা, পড়ালেখার মান সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে নীতিমালার আলোকে এমপিওভুক্তি ও জাতীয়করণ করা হবে। কিন্তু নীতিমালার আওতায় যোগ্য সব বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্তি ও জাতীয়করণ করা হবে কিনা সে সম্পর্কে সুস্পষ্ট তথ্য ওই বক্তব্যে নেই বলেই মনে করছেন আন্দোলনরত শিক্ষকরা। ২০১৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের কারণে সরকার এরই মধ্যে ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়েছে। এখন শিক্ষকদের আন্দোলন না মেনে তাদের জোর করে সরাতে গেলে যে ধরনের উদ্ভুত পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে তা সরকারকে আরও বিব্রত করবে বলেই মনে করছেন বিশেস্নষকরা। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের কার্যক্রমও সরকারকে বারবার বিতর্কিত অবস্থানে নিয়ে গেছে। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার কারণে বিপুল সংখ্যায় সুবিধাবাদী গোষ্ঠী এ সংগঠনটির উচ্চ পর্যায়ে উঠে এসেছেন। অভিযোগ রয়েছে ২০১৪ সালের নির্বাচনের পূর্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অন্য ছাত্র সংগঠনের বিভিন্ন প্রোগ্রামে সামনে থেকে নেতৃত্ব দানকারীরা এখন ছাত্রলীগের গুরম্নত্বপূর্ণ পদে অবস্থান করছেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯টি হলের ১০টিতেই এখন সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদক পদে থাকা একজন বা উভয়ই সাবেক অন্য ছাত্র সংগঠনের নেতা বা কর্মী। নির্বাচনী বছরে এসব সুবিধাবাদীরাও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। প্রতিদিনই কোনো না কোনো ক্যাম্পাসে সহিংসতার ঘটনা ঘটছে। অনেক ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রশাসনও এদের নানাভাবে ব্যবহার করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত সাত কলেজের অধিভুক্তি বাতিলের দাবিতে আন্দোলনরত সাধারণ শিক্ষার্থীদের উপর হামলা ও মেয়ে শিক্ষার্থীদের হয়রানির যে অভিযোগ ছাত্রলীগের বিরম্নদ্ধে উঠেছে তার নির্দেশ প্রশাসন থেকেই দেয়া হয় বলে শিক্ষার্থীরা দাবি করে আসছেন। যা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় বেশ উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। বুধবার হাইকোর্ট এক রিট নিষ্পত্তি করে আগামী ছয় মাসের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ (ঢাকসু) নির্বাচনের যে আদেশ প্রদান করেছে তাকে সরকার ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন শিক্ষা সংশিস্নষ্ট ও রাজনৈতিক বিশেস্নষকরা। দেশের সবচেয়ে বড় এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নির্বাচন দেয়ার প্রথম শর্তই হলো ক্যাম্পাসে সব ছাত্র সংগঠনের সমান সুযোগ নিশ্চিত করা। প্রায় এক দশক ধরে বিরোধী প্রতিদ্বন্দ্বীহীন অন্ত্মঃকোন্দলে জর্জরিত ছাত্রলীগের পক্ষে রাজনৈতিক বিরোধীদের ক্যাম্পাসে আলিঙ্গন করা প্রায় অসম্ভব। এছাড়া বিরোধী ছাত্র সংগঠনগুলো গুরম্নত্বপূর্ণ এ ক্যাম্পাসের সমান সুযোগ পেলে তা বিরোধী রাজনৈতিক গোষ্ঠীর নির্বাচনকালীন সরকারসহ বিভিন্ন দাবিতে ক্যাম্পাসে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি হবে বলেও মনে করছেন বিশেস্নষকরা। যা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের চেয়ে সরকারকেই বেশি সমস্যায় ফেলতে পারে বলেও মনে করা হচ্ছে। এছাড়া ঢাকসু নির্বাচনে সরকারদলীয় প্রার্থী পরাজিত হলে ছাত্রলীগ শিক্ষার্থীদের কাছে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতাও হারাতে পারে বলে ক্ষমতাসীনদের মধ্যে আশঙ্কা রয়েছে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইচ চ্যান্সেলর অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান এ বিষয়ে যায়যায়দিনকে বলেন, ‘নির্বাচনী বছরে সরকারি চাকরিজীবীসহ বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠন সুবিধা আদায়ের জন্য আন্দোলনে নামে এটা অনেকটা স্বাভাবিক। তবে এবার অন্য পেশাজীবীদের চেয়ে শিক্ষকরা একটু বেশিই আন্দোলনমুখী। সরকার অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই থাকবে।’ বাংলাদেশ শিক্ষক ইউনিয়নের সভাপতি ও দেশের সব বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের দাবিতে আন্দোলনে থাকা দেশের শীর্ষ স্থানীয় চারটি শিক্ষক সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত বেসরকারি শিক্ষা জাতীয়করণ লিয়াঁজো ফোরামের উপদেষ্টা মো. আবুল বাশার হাওলাদার এ বিষয়ে বলেন, ‘দেশকে এগিয়ে নেয়ার কথা বলে শিক্ষকদের পিছিয়ে রাখলে দেশ অগ্রসর হবে না। কারণ শিক্ষকদের হাত ধরেই দেশ এগিয়ে যায়। শিক্ষকদের কষ্টে রেখে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছানো অসম্ভব। প্রধানমন্ত্রী যে বক্তব্য দিয়েছেন সেখানে তিনি নীতিমালা মেনে যোগ্য প্রতিষ্ঠানকে এমপিও এবং জাতীয়করণ করার কথা বলেছেন। ফলে আমরা যে জন্য আন্দোলন করছি তাও এর অন্ত্মর্ভুক্ত হওয়ার কথা। কিন্তু আমরা এখনো সরকারের তরফ থেকে আমাদের দাবি মানার পক্ষে কোনো সুস্পষ্ট বক্তব্য পাচ্ছি না। সরকার যদি আমাদের দাবিতে ভ্রূক্ষেপ না করে তবে আমরা আরও কঠোর আন্দালনে যাব।’কঠোর আন্দোলন কি হতে পারে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘প্রয়োজন হলে আমাদের সব শিক্ষকের পাশাপাশি নিজেদের স্ত্রী সন্ত্মানদেরও ঢাকায় নিয়ে এসে আমরণ অনশনে বসার মতো কঠোর অবস্থানে যেতেও আমরা প্রস্তুত আছি।’ শিক্ষাবিদ মহিতুল ইসলাম যায়যায়দিনকে বলেন, ‘শিক্ষক আন্দোলনের চেয়ে সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ নিজ ছাত্র সংগঠনকে নিয়ন্ত্রণ। সংগঠনটি সম্প্রতি যেভাবে হিংস্র হয়ে উঠছে তা নির্বাচনী বছরে দল ও সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এছাড়া হাইকোর্ট আগামী ছয় মাসের ভেতর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের নির্বাচন আয়োজনের নির্দেশ দিয়েছে। বিগত তিন দশক ধরে কোনো সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যা করার সাহস দেখায়নি নির্বাচনী বছরে কোর্টের আদেশে তা করতে গেলে সরকারের সব সমীকরণ উল্টে যেতে পারে। এ নির্বাচনের পূর্ব শর্তই হলো সব ছাত্র সংগঠনের সহাবস্থান। যা ক্ষমতাসীনদের জন্য আত্মহত্যার শামিল। এ ক্যাম্পাসের নিয়ন্ত্রণ যে দল বা ছাত্র সংগঠনের হাতে থাকবে তাদের হাতে কার্যত রাজপথের নিয়ন্ত্রণ চলে যাবে। ফলে শিক্ষকদের আন্দোলন, ছাত্রলীগের কার্যক্রম এবং সর্বোচ্চ আদালতের আদেশে ঢাকসু নির্বাচন দেয়া বা না দেয়ার মতো জটিল বিষয় সরকারকে সঙ্কটে ফেলতে পারে।’
তবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এসব বিষয় সমাধান জটিল হলেও সরকারের পক্ষে তা অসম্ভব নয়। শিক্ষক আন্দোলন এবং ছাত্রলীগকে খুব শিগগিরই নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে বলেও মনে করছে সরকারের একাধিক মহল। তবে ঢাকসু নির্বাচন ইসু্যতে সরকারি দলকে বেশ সতর্ক বলেই মনে হচ্ছে। এ বিষয়ে দলটির কয়েকজন নেতার সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা জানিয়েছেন, আদালতের বিষয়ে তারা সর্বোচ্চ শ্রদ্ধাশীল। তবে ছাত্র সংসদের নির্বাচন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিষয়। ক্ষমতাসীন দল হিসেবে যে ধরনের সহায়তা দেয়া দরকার তাও দেয়া হবে বলে কোনো কোনো নেতা মন্ত্মব্য করেছেন।