ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনরত ‘নিপীড়নবিরোধী’ শিক্ষার্থীদের উপর ছাত্রলীগের হামলার প্রতিবাদে আগামী ২৯ জানুয়ারি ছাত্র ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে বাম ছাত্র সংগঠনের জোট প্রগতিশীল ছাত্রজোট। তারা হামলাকারী ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের গ্রেফতার ও শাস্তি দাবি জানায়। বাম সংগঠনের নেতাকর্মীরা জানিয়েছে, দেশের বিভিন্ন স্থানে তাদের কর্মসূচিতে বাধা দিয়েছে ছাত্রলীগ। এ দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির উপর ‘হামলাকারীদের’ শাস্তি দাবি করেছে ছাত্রলীগ। ভিসির প্রশাসনিক ভবনে সংঘটিত ‘অনাকাক্সিক্ষত’ ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি। তারা মনে করে, মঙ্গলবারের ঘটনা বিশ্ববিদ্যালয়কে অশান্ত করতে বহিরাগত সন্ত্রাসীদের অপপ্রয়াস। গতকাল বুধবার মধুর ক্যান্টিনে এক সাংবাদিক সম্মেলনে জোটের নেতা সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের একাংশের সভাপতি ইমরান হাবিব রুমন ২৯ জানুয়ারি ছাত্র ধর্মঘটের কর্মসূচি ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, এর আগে ২৬ জানুয়ারি বিকেল ৩টায় বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে রাজু ভাস্কর্যের সামনে সংহতি সমাবেশ করা হবে। ভিসি কার্যালয়ে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে হামলার ঘটনায় দায়ী ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের গ্রেফতার, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, দোষীদের শাস্তি, বিশ্ববিদ্যালয়ের খরচে আহতদের চিকিৎসা করা, প্রক্টর কার্যালয় ঘেরাও কর্মসূচির সময় ভাঙচুরের অভিযোগে মামলা প্রত্যাহার এবং বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের নির্বাচন দেওয়ার দাবি জানানো হয় সাংবাদিক সম্মেলনে। সাংবাদিক সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে ছাত্রফ্রন্টের আরেক অংশের সভাপতি নাঈমা খালেদ মনিকা, বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীর সভাপতি ইকবাল কবির, বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক জাহিদ সুজন, ছাত্রফ্রন্টের একাংশের সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন প্রিন্স উপস্থিত ছিলেন। ইমরান হাবিব রুমন বলেন, মঙ্গলবার হামলার ঘটনার প্রতিবাদে প্রগতিশীল ছাত্রজোট আজ সারা দেশে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করছে। সিলেট এমসি কলেজ এবং ঢাকায় মিরপুর বাংলা কলেজে এ কর্মসূচিতেও হামলা হয়েছে। ভিসি অফিসে হামলাকারীদের বহিষ্কারের দাবি ছাত্রলীগের: বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির কার্যালয়ে ‘হামলার’ প্রতিবাদে ‘সচেতন সাধারণ শিক্ষার্থীবৃন্দ’ ব্যানারে মিছিল, মানববন্ধন আর অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা। তারা ভিসিকে ‘লাঞ্ছিত’ ও ছাত্রলীগের নারী শিক্ষার্থীদের ওপর ‘হামলায়’ জড়িতদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বহিষ্কারের দাবি জানায়। গতকাল বুধবার ভিসির কার্যালয়ের সামনে প্রায় দুই ঘণ্টার অবস্থান কর্মসূচিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি আবিদ আল হাসান বলেন, আজকের পর থেকে কেউ যদি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট করে, তাহলে ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে আমরা দাঁতভাঙ্গা জবাব দেব। বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি আবিদ আল হাসান সেখানে বলেন, যদি আমার বাবাকে রক্ষা করতে গিয়ে, আমার শিক্ষককে রক্ষা করতে গিয়ে আমাকে জেলে যেতে হয়, মৃত্যুবরণ করতে হয় আমি তাতেও রাজি আছি। এরপর বেলা সোয়া ১২টার দিকে প্রক্টর অধ্যাপক গোলাম রব্বানী ভিসি ভবনের তালাবন্ধ গেইটের সামনে আসেন ছাত্রলীগ নেতাদের দাবিদাওয়া নিয়ে কথা বলার জন্য। তবে ছাত্রনেতাদের বক্তব্য শেষ হলে শিক্ষার্থীরা লিখিত অভিযোগ জমা দিয়ে চলে যাবেন জানালে প্রক্টর চলে যান। কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে ছাত্রলীগের সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ বলেন, কোনো গেইট ভেঙে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পদ লুটপাট করে কোনো আন্দোলন সংগ্রাম হতে পারে না। তারা কী উদ্দ্যশ্যে দেশীয় অস্ত্র দিয়ে গেট ভেঙেছে তা আপনারা দেখেছেন। একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের ওপর হামলা করেছে, সাধারণ শিক্ষার্থীরা ঘরে বসে থাকতে পারে না। গতকালও সাধারণ শিক্ষার্থীরা বামদের এই আন্দোলনকে প্রতিহত করে দিয়েছিল। ঘটনার সম্পূর্ণ অনুসন্ধান করে ‘সঠিক তথ্য’ উপস্থাপনের জন্য সাংবাদিকদের প্রতি আহ্বান জানান ছাত্রলীগ সভাপতি। তিনি বলেন, আমাদের একটি দাবি, এই ষড়যন্ত্রকারীদের, এই অছাত্র, কুলাঙ্গাদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করতে হবে এবং তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। কর্মসূচি শেষে ছাত্রলীগ কর্মীদের মিছিল মল চত্বর, কলাভবন, কেন্দ্রীয় মসজিদ হয়ে অপরাজেয় বাংলায় এসে শেষ হয়। আজ বেলা ১১টায় মানববন্ধনের ডাক দিয়েছে ছাত্রলীগ সমর্থিত ‘সচেতন সাধারণ শিক্ষার্থীবৃন্দ’ রা। কর্মসূচির সমন্বয়ক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ডিবেটিং সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক নোমান সুমন জানান, আমরা আগামীকাল (বৃহস্পতিবার) বেলা ১১টায় আবার মানববন্ধনের ডাক দিয়েছি। কর্মসূচি থেকে প্রশাসনের কাছে স্মারকলিপি পেশ করা হবে। শিক্ষক সমিতি বলছে বহিরাগত সন্ত্রাসীদের অপপ্রয়াস: ভিসির প্রশাসনিক ভবনে সংঘটিত ‘অনাকাক্ষিত’ ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি। তারা মনে করে, ‘মঙ্গলবারের ঘটনা বিশ্ববিদ্যালয়কে অশান্ত করতে বহিরাগত সন্ত্রাসীদের অপপ্রয়াস।’ গতকাল দুপুরে শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক এ এস এম মাকসুদ কামাল ও সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াতুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এসব কথা জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, প্রশাসনিক ভবনে ভাঙচুর, বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পদের ক্ষতিসাধন এবংশিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে অশালীন আচরণ ও ভিসিকে শারীরিকভাবে নির্যাতনের চেষ্টা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষার্থী দ্বারা সংঘটিত হয়েছে বলে শিক্ষক সমিতি মনে করে না। নির্বাচনের আগে দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে বহিরাগত সন্ত্রাসীরা এমনটা করেছে বলে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়। শিক্ষক সমিতি বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন ও কর্তৃপক্ষকে সাহায্য-সহযোগিতা করতে শিক্ষার্থী-শিক্ষকদের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছে। এ ছাড়া প্রকৃত সত্য তুলে ধরতে দেশের গণমাধ্যমের প্রতিও আহ্বান জানানো হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, কোনো দুষ্টচক্র যেন দেশের চলমান উন্নয়নের ধারাকে ব্যাহত করতে না পারে, সে জন্য গণমাধ্যমকে সত্য ঘটনা প্রকাশের মাধ্যমে সবাইকে সচেতন করার জন্য অনুরোধ করা যাচ্ছে। শিক্ষার্থীর জামা ছেঁড়াকে আত্মরক্ষা বলছে ছাত্রলীগ: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) ভিসির কার্যালয়ে ‘নিপীড়নবিরোধী’ বাম ছাত্র সংগঠনের শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে ছাত্রলীগের হামলার সময় সহপাঠীকে টেনেহিঁচড়ে তার জামা ছিঁড়ে ফেলেন কুয়েত মৈত্রী হল ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শায়লা শ্রাবণী। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে এ ছবি নিয়ে তুমুল সমালোচনা চলছে। ছাত্রী হয়ে সবার সামনে সহপাঠীর জামা ছিঁড়ে ফেলার ছবি ও ভিডিও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে গোটা ছাত্র রাজনীতিকে। তবে ন্যক্কারজনক এ ঘটনা গায়ে লাগাচ্ছে না কেউ। ছাত্রলীগ বলছে, আত্মরক্ষা করতে গিয়ে ঘটেছে এমন ঘটনা। শিক্ষার্থীদের নিপীড়নে ওই নেত্রী নিজেই নাকি এখন অসুস্থ। মঙ্গলবার বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিপীড়নবিরোধী শিক্ষার্থীদের ব্যানারে চলা আন্দোলনে ঘটনাটি ঘটে। এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি আবিদ আল হাসান বলেন, তার (শায়লা) ওপরে ছেলেরা হামলা চালায়, আত্মরক্ষার্থে এমন ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটে থাকতে পারে। তিনি বলেন, ‘কয়েকটা ছেলে তাকে (শায়লা) আক্রমণ করেছে সেটা দেখেননি? ৮ থেকে ১০ জন ছেলে তাকে নিপীড়ন করলে সে কি নিজেকে বাঁচানোর জন্য এমন করতে পারে না?’ অথচ ফেসবুকে ভাইরাল হওয়া একটি টেলিভিশনের ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, শিক্ষার্থীদের ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে ওই শিক্ষার্থীর চুল ধরে পাশে নিয়ে যান শায়লা। সেখানে তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে ছিঁড়ে ফেলেন তার জামা। শুধু মঙ্গলবার নয়, চলতি মাসের ১৫ তারিখ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির কার্যালয়ের সামনে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের আন্দোলনেও হামলা চালায় ছাত্রলীগ। ওইদিন নারী শিক্ষার্থীদের হেনস্তা করার ছবি তুলতে গেলে এনটিভি অনলাইনের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক মামুন তুষারকে লাঞ্ছিত করে শায়লা। ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়ার চেষ্টা করে। ভাঙচুর করে মুঠোফোন। ফেসবুকে বিরূপ প্রতিক্রিয়া: ছাত্রলীগ নেত্রীকে মারধর ও জামা ছেঁড়ার ছবি ফেসবুকে ভাইরাল হওয়ার পর তা নিয়ে ফেসবুকে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে শিক্ষার্থীরা। এম এইচ খান নামে এক শিক্ষার্থী লিখেছেন, ‘সমস্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের রাজনীতি বন্ধ করতে হবে! ক্ষমতার অপব্যবহার বন্ধ করতে হবে। শিক্ষার্থীদের কোনো প্রকার রাজনৈতিক ক্ষমতা দেয়া যাবে না। শিক্ষার্থীদের কাজ পড়াশোনা করা।’ মোহাম্মদ সোহরাওয়ার্দী নামে এক শিক্ষার্থী লিখেছে, ছাত্র-ছাত্রীদের দলীয় রাজনীতি নিষিদ্ধ করা উচিত। ছাত্র-ছাত্রীরা দেশকে প্রতিনিধিত্ব করে, কোনো দলকে নয়। অনেকে স্বাধীনতা আন্দোলনের, ভাষা আন্দোলনের দোহাই দেন, আরে ভাই সেই আন্দোলন ছিল দেশের জন্য আর এখন যেটা হচ্ছে সেটা ক্ষমতা আর টাকার জন্য।এ দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক প্রেসবিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ভিসি অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামানকে হেনস্তা ও কার্যালয়ে ভাঙচুরের ঘটনায় কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মো. কামাল উদ্দীনকে আহ্বায়ক পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত কমিটিকে দ্রুত প্রতিবেদন দেয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে।