কলকাতায় এসেছিলেন বলিউডের ব্যস্ততম সংগীত পরিচালক ‘ঘরের ছেলে’ প্রীতম চক্রবর্তী। ব্যস্ততার ফাঁকে একটু নিজের শহরকে সময় দিতে। এ সময় তাঁর একটি সাক্ষাৎকার নেওয়া হয় আনন্দবাজারের বিনোদন ক্রোড়পত্র আনন্দ প্লাস-এ…প্রশ্ন : ‘জব হ্যারি মেট সেজল’, ‘জগ্গা জাসুস’ ভালো না চললেও আপনার কাজ সকলের ভালো লেগেছে। আপনি খুশি নিশ্চয়ই?
উত্তর : খুশি। তবে গানের সাফল্যের জন্যই ছবিটা চলা জরুরি। অনেক গান থাকে, যা আগে দেখানো হয়নি। ছবি হিট হলে সেই গানগুলো একদম হারিয়ে যায় না।

প্রশ্ন : ‘জগ্গা…’র পর কি ভারতীয় শ্রোতারা ‘মিউজিক্যাল’ শুনতে তৈরি হয়েছেন?
উত্তর : আমরা ভারতীয়রা বরাবরই ‘মিউজিক্যাল’ শুনতে তৈরি। রামলীলা, লোকগাথা শুনে শুনে তো বড় হয়েছি। তবে ‘জগ্গা…’য় কাজ করতে পেরেছি বলে গর্ব হয়। এ রকম ব্রডওয়ে মিউজিক্যাল ছবি করার সুযোগ তো বারবার আসে না! আরো এ রকম কাজ করতে চাই। কিন্তু অনুরাগ (বসু) যে ঝুঁকিটা নিয়েছে, সেটা আর কেউ নেবেন কি না, সন্দেহ রয়েছে। তবে ছবির ব্যাকগ্রাউন্ডে ব্যবহার করা মিউজিক্যালের সাউন্ডট্র্যাক এখনও রিলিজ করা হয়নি। খুব ইচ্ছে, যেন সেটা তাড়াতাড়ি মুক্তি পায়।

প্রশ্ন : অনেকে একসঙ্গে একই ছবিতে সুর দিচ্ছেন। এর অসুবিধে কী?
উত্তর : মাল্টি-কম্পোজারার ছবিতে নতুন সুরকাররা কাজের সুযোগ পান। বলিউডের মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির ইতিহাস খুঁটিয়ে দেখলে বুঝবেন, তিন-চারজন সুরকারই গোটা বাজার নিয়ন্ত্রণ করতেন। মাল্টি-কম্পোজারার ছবির ক্ষেত্রে সেই মুষ্টিমেয় মানুষের মুঠোর মধ্যে ক্ষমতা ধরে রাখার প্রবণতা কমেছে। উল্টো দিকে, অনেকে একই ছবিতে সুর দিলে, ছবির সামগ্রিক স্কোরে সামঞ্জস্যটা কোথাও হারিয়ে যায়।

প্রশ্ন : ‘ইয়ে জওয়ানি হ্যায় দিওয়ানি’র ‘ইলাহি’, ‘বরফি’র ‘কিঁউ’ প্রোমোট করা হয়নি। অথচ এগুলো জনপ্রিয়। গানের প্রোমোশনে আপনি সন্তুষ্ট?
উত্তর : দেখুন, কোনো ছবির সব গান একসঙ্গে প্রোমোট করা সম্ভব নয়। ছবির প্রথম তিনটে গান বেশি প্রভাব ফেলে। ঠিক এই কারণেই আমি ভগবানের কাছে প্রার্থনা করি, যেন ছবিটা ভালো চলে। ছবি ভালো চললে, গানগুলোও বেশি করে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। এখানে আপনি প্রশ্ন করেছেন ‘ইলাহি’ আর ‘কিঁউ’ নিয়ে। কারণ, দুটো ছবিই ভালো চলেছে। ছবি না চললে অনেক ভালো গান হারিয়ে যায়। যেমন ‘জব…’-এর ‘ঘর’ অথবা ‘জগ্গা…’র ‘মুসাফির’। ছবি দুটো ভালো চললে ‘ঘর’, ‘মুসাফির’ও হিট হতে পারত! ‘লাইফ ইন আ মেট্রো’, ‘জব উই মেট’, ‘ককটেল’-এর কয়েকটা গান প্রোমোট করা হয়নি। কিন্তু সেগুলো মানুষ পছন্দ করেছেন। আবার কখনও গান তৈরি করা হয়, অথচ ছবিতে সেটা থাকে না। নন- প্রোমোটেড গানগুলো হারিয়ে গেলে সত্যিই মন খারাপ হয়। কিন্তু এটাই তো জীবন। (হেসে)

প্রশ্ন : আপনার মতে এ যুগে ঈশ্বরপ্রদত্ত কণ্ঠ কার?
উত্তর : স্রষ্টা অনেককে সুন্দর কণ্ঠ দিয়েছেন। তবে আসল খেলাটা হলো, সেটা কে কতটা কাজে লাগাচ্ছেন। যদি কারও জেমস, পাপন বা ঊষা দি’র (উত্থুপ) মতো ইউনিক গলা থাকে, তা হলে তাকে ভার্সেটাইল গানের চেষ্টা করতে হবে। আবার কারও গলা যদি ইউনিক না হয়েও ভার্সেটাইল হয়, তা হলে গলার টেক্সচার নিয়ে কাজ করতে হবে। এই কাজটা সবচেয়ে ভালো করছে অরিজিৎ (সিং)। অরিজিৎ ওর মিউজিক্যাল ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে নিজের গলাকে শাসন করে। স্টুডিওয় তো মজা করা হয় এই বলে যে, অরিজিতের ভোকাল কর্ডে নানা রকম সেটিং থাকে! আমি গানের আগে ওকে ব্রিফ করি, ‘আজ এই সেটিংটা হোক কিংবা ওটা!’

প্রশ্ন : ইমতিয়াজ আলি ও অনুরাগ বসু… কার সঙ্গে কাজ করা সহজ?
উত্তর : ইমতিয়াজ আমার বন্ধু। আমরা সমবয়সী। তবে আমি অনুরাগের অ-নে-ক বেশি কাছের। অনুরাগের সঙ্গে আমি এমন অনেক সিক্রেট শেয়ার করতে পারি, যা অন্য কারো সঙ্গে পারি না। অনুরাগের সঙ্গে কাজ করাও অনেক সহজ। অনুরাগ আমাকে আমার চেয়েও ভালো চেনে।

প্রশ্ন : পার্টি না সফট- কোনটায় কাজ করতে বেশি ভালোবাসেন?
উত্তর : সফট গান হৃদয় থেকে আসে। আর পার্টি নাম্বারে কাজ মস্তিষ্কের। আমার অনেক হিট পার্টি সং আছে। কিন্তু পার্টি সং কম্পোজ করতে একদম পছন্দ করি না। রোমান্টিক, স্যাড, ডার্ক সং করতেই ভালোবাসি। নেহাতই বন্দুকের ডগায় দাঁড়াতে হলে আমি মেলোডিয়াস পার্টি সং বানাব। যেমন ‘লাত লগ গয়ি’, ‘তুম হি হো বন্ধু’।

প্রশ্ন : একসঙ্গে মাল্টি-জঁরে কাজ করতে অসুবিধে হয় না?
উত্তর : বলিউডের সুরকারদের সব ধরনের কাজে পারদর্শী হতে হয়। মাল্টি-জঁর কম্পোজিশনের মজা হলো, কাজটা আমার একঘেয়ে লাগে না। একসঙ্গে ‘অ্যায় দিল…’, ‘জগ্গা…’, ‘জব…’, ‘দঙ্গল’-এ কাজ করছি। প্রত্যেকটা আলাদা। ফলে কাজ করতে মজাই লাগে। তবে কোনো প্রজেক্ট থেকে মানসিক ভাবে বেরোতে পারছি না। বা রোমান্টিক গানের সুর ভাসছে, কিন্তু সুর দিতে হবে পার্টি নাম্বারের। তখন বৈপরীত্য তৈরি হয়। তবে সেটা অসুবিধের বলে মনে করি না।

প্রশ্ন : কোন গানটায় নিজেকে সবচেয়ে বেশি কানেক্ট করতে পারেন?
উত্তর : মেলোডিয়াস গান আমার কাছের। আর যেগুলো প্রোমোট করা হয় না, সেগুলো স্পেশাল। যেমন ‘অ্যায় দিল’-এর ‘আলিজা’। আবার যদি ‘চন্না মেরেয়া’কে প্রোমোট না করা হতো, তা হলে হয়তো সেটাই বেশি কাছের হতো!

প্রশ্ন : সুর দিতে দিতে নিজেকে কখনও নিঃশেষিত মনে হয়েছে?
উত্তর : আমি ওয়র্কহোলিক। নেশাটাই আমার পেশা। ১৫ বছর ধরে ১২০টারও বেশি ছবিতে ৬০০-৭০০ গানে কাজ করেও ক্লান্ত লাগে না। তবে প্রচুর কাজ করতে করতে টায়ার্ড হয়ে গেলে ৪-৬ মাসের ব্রেক নিই। মানসিক ভাবে শূন্য লাগলে সিনেমা দেখতে বসে পড়ি!

প্রশ্ন : এর পর কী করছেন?
উত্তর : এপ্রিলে উত্তর আমেরিকায় ট্যুর আছে। সেটার প্রস্তুতি চলছে।

প্রশ্ন : শহরে ফিরে কেমন লাগছে?
উত্তর : রিইউনিয়ন তো পুরোটাই। স্কুল-কলেজের কত বন্ধুর সঙ্গে দেখা হচ্ছে। তবে জানেন, খুব মিস করি কলকাতাকে। দুর্গাপুজো, কালীপুজো, ভাইফোঁটায় মন কেমন করে। আর পুরনো পাড়াটার কথা…