বিংশ শতাব্দী বিদায় হওয়ার পরে এসেছে একুবিংশ শতাব্দী। বিজ্ঞান এগিয়েছে। সাথে পাল্লা দিয়ে এগিয়েছে পুরুষ। কিন্তু নারী ! শুধু পিছিয়েছে নারী। কেন এই পিছিয়ে যাওয়া ? কারণ নারীদেরকে সভ্যতার শুরু থেকে পুরুষের তুলনায় বেশি কাপড় জড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। সে যুগের ইতালি পর্যটক ম্যানরিক বলছেন বাঙলাদেশে ছেলেরা শরীর ঢাকে ৭-৮ বিগৎ লম্বা কাপড়ে। অথচ মেয়েরা তা ঢাকে ১৮-২০ বিগৎ কাপড়ে। এখানেই পুরুষ এবং নারীদের অধিকারে ফারাক।যুগ যুগ সময় ধরে। নারীরা তখন ছিল ধর্মের কারণে পশ্চাৎমুখী। কখনও সামাজিক কারণে ভোগের। কখনও পারিবারিক কারণে বিলাসের। তবে মৌলবাদের থাবা পরেছে নারীদেরকে লক্ষ্য করে যুগের আদি থেকেই। এখনও সে চিন্তা থেকে পুরোপুরি বেড়িয়ে আসতে পারে নাই সমাজ। পরিবার থেকে সমাজ সুযোগ পেলেই পর্দাতে ফিরিয়ে নিতে চায় নারীদেরকে। পর্দা শব্দটা এসেছে ফার্সি ভাষা থেকে। যেটার অর্থ যবনিকা বা অবগুন্ঠন। কিন্তু আমাদের কাছে পর্দা শব্দের অর্থ আসবে যেন এক সামাজিক রীতি হিসেবে। এখন নারীরা শিক্ষায় আছে। কিন্তু তাদের পূর্ব সতীর্থরা কখনই সেখানে যেতে পারেন নাই। পর্দায় আছে, শিক্ষাই ছিল না। এ অবস্থা থেকে নারীরা যখন বঞ্চিত হয়েছে। তখন তারা পিছিয়েছে অর্থনৈতিক অবস্থা, সামাজিক অবস্থা, রাজনৈতিক অবস্থা এমন কি পারিবারিক অবস্থা থেকে, কিন্তু পুরুষেরা এগিয়েছে এমন সব জীবন চলকের মূল উপাদান বেয়ে। এভাবে নারীকে কৌশল খাটিয়ে দাবিয়ে রেখে পুরুষদের অধিকারকে প্রতিস্থাপিত করা হয়েছে। আবার এভাবেই নারীদের যৌনতা ও প্রজননের সতীত্বের উপরে পুরুষের নিয়ন্ত্রণ তৈরী করা হয়েছে দিনে দিনে।
এ দেশে আঠারো শতকের আগে-পরে নারীরা যুদ্ধে, বিদ্রোহে, দেশ শাসনে যুক্ত ছিলেন। নাটোরের রানী ভবাণি। তিনি দক্ষ শাসক ছিলেন। নবাব সিরাজদৌলার খালা ঘসেটি বেগম একজন শিক্ষিত, প্রত্যয়ি, প্রতিভাময়ি নারী ছিলেন। যে জন্য স্বামী মারা গেলে তিনি জাহাঙ্গিরনগর সুরার দেওয়ান নিযুক্ত হয়েছিলেন। রংপুরের জমিদার জয়দূর্গা চৌধুরানী, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, প্যারি সুন্দরি,দেবী চৌধুরানী। যারা তেজস্বীনি বীর হয়েছিলেন জমিদারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। এই উপমহাদেশে ধর্মীয় কারণে একই নারীরা ছিলেন ভিন্ন ভিন্ন অধিকারভোগি। হিন্দু, মুসলিম, সাঁওতাল, মন্ডা, বৌদ্ধ,খৃস্টান এমন আরো অনেক। এদের এক একজন নারীর জীবন চলক এক এক রকমের। ১৮২০ খ্রি: বৃটিশ নাগরিক ডেভিড হেয়ারসহ স্থানীয় কয়েকজন হিতৈষী মিলে মেয়েদের জন্য একটি স্কুল তৈরী করলেন। এছাড়া জে.ই.ডি বেথুন তার নামে যে বেথূন স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তা ছিল এ অঞ্চলের প্রথম নারী শিক্ষার মাইল ফলক। ব্রাম্ম সমাজ নারী শিক্ষায় অনেক আগেই কাজ করেছে। এরপর মুসলিম নারীদের শিক্ষায় এগিয়ে আসেন ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী,বেগম রোকেয়া সাখাওয়াতসহ আরো অনেকে। এখন নারী শিক্ষা সরকারের অগ্রাধিকার একটি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের বিষয়। যে জন্য বিচারে, শৃঙ্খলায়,চিকিৎসায়,উড়ালে,রাজনীতিতে সন্মুখে এসেছে নারী। আমাদের রাজনীতিতে ১৯৪৭ সালের আগে যেমন নারীরা সক্রিয় ছিলেন। আবার ১৯৪৭ সালের পরেও তারা নিজেদেরকে রাজপথে সক্রিয় রেখেছেন। ১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে পাকিস্থানীদের কাছে আমাদের নারীরা ভোগের ও বিলাসের থাকলেও তারা আমাদের কাছে ছিলেন মহান ত্যাগের এবং গর্বের।নারীদেও মূল্যবান ত্যাগ আমাদের জন্য এনেদিয়েছে একটি পতাকা এবং একটি মানচিত্র।
এতসবের পরেও আমাদের দেশে সাধারণ নারীরা কখনও কখনও প্রতিক্রিয়াশীলদের শক্তি ও গেঁড়োয় আবদ্ধ। যে কারণে শ্রমে নারীদের ঘামের কোন মূল্য না থাকলেও ধর্মান্ধবাদীরা এই নারীদের শুধু শরীরকে পছন্দ করে। এখনও প্রথার মধ্যে থাকতে এরা নারীদেরকে ভয় ও লোভ দেখায়। নানা ফতোয়ায় নারীদেরকে দাবিয়ে রাখতে চায়। সাধারণ নারীরা আজও পারিবারিক সহিংসতায় বিক্ষত। তারা পরিবারেই বৈষম্যের শিকার। তারা ইভটিজিং, যৌন হয়রানির শিকার। সন্তানের দায়ভার একক যেমন নারীদের, আবার অভাবের দায়ে এই নারীরাই কেবল অভিযুক্ত। তারা শ্রম দিয়ে আয় করেন, তবে ব্যয় করার ক্ষমতা রাখেন না। এই নারীরা এখনও রান্না করে তবে ভালটুকু নিজে খেতে পারে না। তবে সময় এসেছে, পেছনে চলার এই প্রথা থেকে বেড়িয়ে আসতেই হবে। দেশের রপ্তানী আয় করে বৈদেশিক মুদ্রা এবং রেমিটেন্স আয় যদি এই সাধারণ নারীরা করতে পারে, তবে তাদেরকে জীবনের মূল ধারায় এগিয়ে আনতেই হবে। বিজ্ঞানের গতিতে এই নারীদেরকে চলকের গতিতে ফিরিয়ে দিতে হবে। সে জন্য বলতেই হয়, হে নারী প্রথা ভাঙ। বেরিয়ে এসো আলোর কাছে। লেখক: গবেষক, উদ্ভাবক ও পরিবেশ ব্যক্তিত্ব।