হালং বে অবগাহন

হালং বে দেখা ছাড়া ভিয়েতনাম সফর অনেকটা ডেনমার্কের রাজপুত্র ব্যতীত হ্যামলেট মঞ্চায়নের মতো ব্যাপার। ভিয়েতনামের কুয়াং নিন প্রদেশের হালং বে সারা বিশ্বের পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণীয় কেন্দ্র। গত নভেম্বর মাসে মৃদু শীতের কাঁপনকে সঙ্গী করে মেঘলা আকাশের নিচে হালং বের সৌন্দর্যপুরীতে অবগাহন করি আমরা ১৮ জন। অন্তহীন নীল আকাশ, নিচে সুবিস্তৃত নীল জলরাশি, কিছুদূর পরপর ত্রিভুজ, চতুর্ভুজ আকৃতির সবুজ পাহাড়ের দ্বীপ—এককথায় এই হচ্ছে হালং বে। বাকরুদ্ধ হওয়ার মতো সৌর্ন্দয এই স্থানটির। ইউনেসকো ১৯৯৪ সালে বিশ্বঐতিহ্যের অংশ (ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট) হিসেবে ঘোষণা করে হালং বেকে। ২০১২ সালে নতুন প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্যের অন্যতম হিসেবে স্থান পায় হালং বে। একটি নৌকায় চড়ে এই অসীম সৌন্দর্য উপভোগ করতে শুরু করি। বিশাল নীলের বুকে যেন অগণিত পাহাড়-টিলা ভাসছে। হালং বের উৎপত্তি সম্পর্কে স্থানীয় কিংবদন্তিটি বেশ চিত্তাকর্ষক। ভিয়েতনাম যখন দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে শুরু করেছে তখন বিদেশি আগ্রাসী শক্তি দখল করার চেষ্টা করে। দেশকে রক্ষার জন্য ঈশ্বর কয়েকটি ড্রাগনের এক পরিবার পাঠিয়ে দেন সেখানে। ড্রাগনরা অসংখ্য মণি-মাণিক্য ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দেয়। এই মণি-মাণিক্য জড়ো হয়ে দ্বীপে রূপান্তরিত হয় এবং দ্বীপগুলো সংঘবদ্ধ হয়ে দুর্ভেদ্য দেয়ালের রূপ ধারণ করে। জাদুর মতো অগণিত পর্বত জন্ম নেয় সমুদ্রের বুকে এবং শত্রুদের জাহাজগুলো পর্বতের দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে ধ্বংস হয়। যুদ্ধ জেতার পর ড্রাগনরা সিদ্ধান্ত নেয় এই উপসাগরে থেকেই পৃথিবীর সৌন্দর্য উপভোগ করার। যে স্থানটিতে মা ড্রাগন আসন গ্রহণ করে এর নাম ছিল হালং। এভাবেই হালং বের উৎপত্তি।হালং বে একাধিকবার ভিয়েতনামের রক্ষাব্যূহ হিসেবে কাজ করেছে। এখানে অবস্থান নিয়ে তিনবার ভিয়েতনামের সেনাবাহিনী চীনের সৈন্যদের প্রতিরোধ করেছে। ১২৮৮ সালে মোঙ্গলীয় শাসক কুবলাই খান তার নৌবহর নিয়ে ঢুকতে চেষ্টা করেন ভিয়েতনামে। দেশটির সেনাবাহিনী কুবলাই খানের নৌবহরের সলিলসমাধি ঘটায় হালং বেতে। গত শতাব্দীতে ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় বেশ কয়েকটি দ্বীপে মাইন বসায় মার্কিন নৌবাহিনী। এর পরিণতিতে এই দ্বীপগুলোর পাশ দিয়ে জাহাজ চলাচল এখনো হুমকির মুখে। মাইনের হুমকি আমাদের বিচলিত করতে পারেনি। আমরা কখনো নৌকার ভেতরে কখনো ছাদের ওপরে এসে এই উপসাগরের সৌন্দর্য দেখেছি। রাশি রাশি পাহাড়ের পাশ ঘেঁষে এগিয়ে চলে আমাদের নৌকা। এরই মধ্যে নৌকার নিচতলায় নেমে দুপুরের খাবার খাই। এই উপসাগরের বিচিত্র মাছ ছিল খাবারের বাড়তি আকর্ষণ। পৃথিবীর ইতিহাসের সমান্তরাল পথচলা এই আকর্ষণীয় উপসাগরের। কমপক্ষে ৫০ কোটি বছর আগে উৎপত্তি এই অনন্য স্থানটির। অতি দীর্ঘ সময়ে পর্বতের বৈচিত্র্যময় ভূতাত্ত্বিক বিবর্তন, সামুদ্রিক অতিক্রমণ, সামুদ্রিক পশ্চাদপসরণের মধ্য দিয়ে গঠিত হয়েছে হালং বের অবয়ব। আমাদের সঙ্গে ভ্রমণসঙ্গী ছিলেন ভিয়েতনামের দুজন সরকারি কর্মকর্তা। তাঁদের মুখে হালং বের প্রাগৈতিহাসিক ও কৌতূহলসঞ্চারী বর্ণনা শুনে এক ঘোরের মধ্যে পতিত হয়েছিলাম। হালং বের অগণিত পাহাড়ের গুহার ভেতরে বড়টির নাম সাং সত কেভ। সিঁড়ির শতাধিক ধাপ বেয়ে দেখা মিলল এই গুহার। রহস্য ও সৌন্দর্যের মিশেলে তৈরি এই স্থানটি বরাবরই পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। ১৯০১ সালে ফরাসি পর্যটকেরা এই গুহা দেখে মুগ্ধ হয়ে বলেছিলেন বিস্ময়কর গুহা, ভিয়েতনামিদের ভাষায় যেটা সাং সত কেভ। এই গুহা ঘুরতে ঘুরতে চোখে পড়ল বিভিন্ন দেশের অভিযাত্রীরা পরম কৌতূহলে মানব ইতিহাসের কালের যাত্রার ধ্বনি উপভোগ করছে। বন্ধুর, সর্পিল ও পিচ্ছিল গুহার পথে পথে বিস্ময় ছড়ানো। সহস্র বছরের পুরোনো পাথর নানা অবয়বে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। পর্যটকদের বেগবান পদযাত্রা দেখে রবীন্দ্রনাথের পঙ্‌ক্তি মনে পড়ল—‘আলো হাতে চলিয়াছে আঁধারের যাত্রী।’নানা দেশের পর্যটকদের মুগ্ধ দৃষ্টি এই গুহাকে ঘিরে। আলো-আঁধারের মিশেল কখনো কখনো চমকে দিচ্ছে আমাদের। কেউ কেউ ঝুঁকি নিয়েই উঁচু-নিচু পাথরের ওপরে উঠে ছবি তুলছে, দলবদ্ধভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ছে সেলফি তোলার জন্য। শৈশবে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সমাজ বইয়ে আদিম মানুষের জীবনযাত্রা পড়েছিলাম। গুহায় জীবনধারণকারী সেই পূর্বপুরুষদের পদাঙ্কই যেন অনুসরণ করছি আমরা। পার্থক্য শুধু পোশাকে। আদিম মানুষদের গায়ে ছিল গাছের ছাল-বাকল বা পশুর চামড়া নির্মিত আচ্ছাদন। আর এ যুগের মানুষের পরনে আধুনিক পোশাক। এই বিস্ময়কর গুহা দুটি ভাগে বিভক্ত। প্রথম ভাগে ঢুকলে মনে হবে কোনো মগ্ন থিয়েটার বুঝি। চুনা পাথরে তৈরি দণ্ড সেখানে আলোয় ঝলমল করছে যেন মখমলের কার্পেট বিছানো। একটি সরু রাস্তা দিয়ে প্রবেশ করতে হয় দ্বিতীয় ভাগে, যেখানে গাদাগাদি করে এক হাজার মানুষ অবস্থান করতে পারে। প্রবেশের ডান পাশে পাথর নির্মিত একটি ঘোড়া ও তলোয়ার চোখে পড়ে। থানসিয়াং নামে সেই অশ্বারোহীকে ঘিরে একটি গল্প চালু আছে। তিনি ভিয়েতনামের ইতিহাসের লোকনায়ক। আগ্রাসী শক্তিকে পরাজিত করে তিনি স্থানীয় জনগণকে মুক্ত করেছিলেন। শত্রুদের বিতাড়িত করার পর তিনি আকাশে উড়ে যান এবং তাঁর ঘোড়া ও তলোয়ার রেখে যান জনসাধারণের সুরক্ষার জন্য। এই লোকান্তরিত লোকনায়কের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে সমাপ্তি ঘটে আমাদের হালং বে যাত্রার।

2018-01-07T10:00:12+00:00January 7th, 2018|বিশেষ প্রতিবেদন|
Advertisment ad adsense adlogger