বিদেশী শিক্ষার্থী প্রশ্নে নমনীয় মে

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টেরেসা মে তার দেশে উচ্চ শিক্ষা লাভের জন্য আগত শিক্ষার্থীদের সংখ্যা মোট অভিবাসীদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত না করার বিষয়ে তার নমনীয় মনোভাব প্রকাশ করেছেন। এতদিন যাবত পার্লামেন্ট সদস্যদের দাবি ও তার মন্ত্রিসভার সদস্যদের অব্যাহত চাপের কাছে নতি স্বীকার করে তিনি এই পথ অবলম্বন করলেন বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। খবর গার্ডিয়ান ও ইন্ডিপেন্ডেন্ট। টেরেসা মে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালে এবং আগাম নির্বাচন পূর্ববর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ব্রিটেনের আর্থ-সামাজিক ও নিরাপত্তাজনিত সমস্যার জন্য সেখানে আগত বিদেশী শিক্ষার্থীদের অনেকাংশে দায়ী করেন। সে সময় তিনি ব্রিটেনের কিছু ভুয়া ও নিম্নমানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে এসব ছাত্রদের ভিসা প্রদানে সহযোগিতার জন্য দায়ী করে বলেন, এদের অনুমোদন পেয়ে বিদেশী ছাত্ররা নির্বিচারে সে দেশে ঢুকে স্থানীয়দের চাকরির বাজার সঙ্কুচিত করে স্থায়ীভাবে বসবাস করছে। যার দরুন নানা ধরনের সামাজিক ও নিরাপত্তামূলক সমস্যার উদ্ভব হচ্ছে। কিন্তু গতবছর সরকার পরিচালিত জাতীয় পরিসংখ্যান দফতরের এক তথ্য উপাত্ত অনুযায়ী দেখা গেছে যে, বিদেশী শিক্ষার্থীদের সিংহভাগই শিক্ষা জীবন শেষে নিজ নিজ দেশে ফিরে যায়। মুষ্টিমেয় শিক্ষার্থী ব্রিটেনে অবস্থান করলেও তা সেদেশের জন্য খুব একটা বিরূপ পরিস্থিতির সৃষ্টি করে না। তাই ব্রিটেনে পড়তে আসা শিক্ষার্থীদের তালিকা সেদেশে আগত অন্য অভিবাসীদের সংখ্যার সঙ্গে মিলিয়ে ফেললে তা জনগণকে ভুল বার্তা দেবে। তাই এই প্রতিবেদনে শিক্ষার্থীদের ব্রিটেনে আগমন ও নির্গমনের আলাদা তালিকা প্রণয়নের সুপারিশ করা হয়। উল্লেখিত তথ্য ও প্রাপ্ত সুপারিশের আলোকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আমবার রাড, অর্থমন্ত্রী ফিলিপ হ্যামন্ড, পররাষ্ট্রমন্ত্রী বোরিস জনসন ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমন্ত্রী লিয়াম ফক্স ব্রিটেনে আগত বিদেশী শিক্ষার্থীদের আলাদা তালিকা প্রকাশ করে তাদের ওপর আরোপিত কঠোর বিধিনিষেধ প্রত্যাহারের পক্ষে তাদের অভিমত প্রকাশ করেন। কিন্তু টেরেসা মের ব্রেক্সিট সংক্রান্ত গণভোট ও প্রচার প্রচারনার অন্যতম ইস্যু ছিল বিদেশী শিক্ষার্থী ও অভিবাসী আগমন ঠেকানো। এখন যদি প্রধানমন্ত্রীর কণ্ঠে উল্টো সুরে গান গাওয়া হয় তবে দলে বিশেষ করে এমপিদের মধ্যে বিদ্রোহ দেখা দিতে পারে। এদিকে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতামত বিশ্লেষণ করে এটি স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, ব্রেক্সিট পরবর্তী সময়ে ব্রিটেন মারাত্মক আর্থিক সঙ্কটে পতিত হতে পারে। বিভিন্ন বিদেশী কোম্পানি ও প্রতিষ্ঠান তাদের সদর দফতর লন্ডন বা ব্রিটেন থেকে সরিয়ে ইউরোপের মূল ভূখ-ে নিয়ে যেতে পারে। এসব সম্ভাব্য সঙ্কট মোকাবেলায় টেরেসা ইতোমধ্যেই সৌদি আরব, জাপান, চীন সফর করেছেন। এসব দেশ সফরকালে কোন দেশে যুদ্ধ সরঞ্জাম বিক্রি, কোথাও গিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান না সরানোর তদবির ছিল। এবার তিন দিনের চীন সফরে গিয়ে টেরেসা চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে সাক্ষাত করে দু’দেশের মধ্যে বাণিজ্য বৈষম্য কমিয়ে আনার লক্ষ্যে বিভিন্ন পন্থা উদ্ভাবনের কথা বলেন। এ সময় তিনি চীনের মেধাবী শিক্ষার্থীদের ব্রিটেনে শিক্ষা গ্রহণের আমন্ত্রণ জানান। তার এই আমন্ত্রণ বিদেশী শিক্ষার্থীদের প্রতি তার সরকারের কঠোর মনোভাবের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয় বলে সাংবাদিকরা দৃষ্টি আকর্ষণ করলে টেরেসা মে নানাভাবে এর ব্যাখ্যা দিতে সচেষ্ট হন। বেজিং থেকে টেরেসা তার বিশেষ বিমান আরএএফ ভয়েজারে করে চীনের বৃহত্তম বিশ্ববিদ্যালয় শহর উহানে যাওয়ার পথে তিনি সাংবাদিকদের বিভিন্ন কথার জবাব দেন। এর আগে স্বদেশে তার অর্থনীতি বিষয়ক উপদেষ্টারা ব্রেক্সিট পরবর্তী সামগ্রিক অর্থনৈতিক সঙ্কট মোকাবেলায় টেরেসাকে বিভিন্ন দিক নির্দেশনা দেন। তারা বিদেশী শিক্ষার্থীদের ব্রিটেন আগমনে আরও উৎসাহমূলক কর্মকা- গ্রহণের পরামর্শ দেন। তারা জানান, বেশি পরিমাণে বিদেশী শিক্ষার্থীদের আগমনে ব্রিটিশ অর্থনীতি সমৃদ্ধ এবং সরকারী কোষাগারে লাখ লাখ পাউন্ড জমা হবে। এ প্রসঙ্গে হায়ার এডুকেশন পলিসি ইনস্টিটিউট এবং কাপলান ইন্টারন্যাশনাল পাথওয়েস নামে দুটি গবেষণা সংস্থার এক যৌথ জরিপে দেখা গেছে যে, ব্রিটিশ অর্থনীতির প্রতিটি স্তর বিদেশী শিক্ষার্থীদের ব্যয় করা অর্থের দ্বারা লাভবান হচ্ছে। তাদের কাছ থেকে শিক্ষাখাত ও অন্যান্য বিষয়ের জন্য আদায়কৃত অর্থের পরিমাণ দশগুণ বেশি, বছর শেষে যার পরিমাণ দাঁড়ায় বিশ দশমিক তিন বিলিয়ন পাউন্ডের সমপরিমাণ। উল্লেখ্য, চীনের বিশ্ববিদ্যালয় শহর উহানের শিক্ষার্থী সংখ্যা বিশ্বের বৃহত্তম স্থান দখল করে আছে। এসব চীনা শিক্ষার্থীদের জন্য টেরেসা ব্রিটিশ শিক্ষা খাতে পাঁচ শ’ পঞ্চাশ মিলিয়ন পাউন্ডের এক চুক্তির কথা ঘোষণা করেছেন। বর্তমানে দেড় লাখেরও বেশি চীনা শিক্ষার্থী ব্রিটেনে অবস্থান করে সেদেশের অর্থনীতিতে বছরে পাঁচ বিলিয়ন পাউন্ডের বেশি যোগান দিচ্ছে।

 

2018-02-04T07:40:34+00:00February 4th, 2018|আন্তর্জাতিক|
Advertisment ad adsense adlogger