শর্তে ছাড়া পেয়ে ভারত গেলেন লাবুঃ সবুজের ভাগ্যে কি ঘটছে?

শর্তসাপেক্ষে র‌্যাবের হাত থেকে ছাড়া পেয়ে অবশেষে একেবারে চুপিসারেই এবার ভারত পাঁড়ি জমালেন কুষ্টিয়া জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি আকতারুজ্জামান লাবু। বৃহস্পতিবার দুপুরের দিকে যশোরের বেনাপোল চেকপোস্ট দিয়ে স্বস্ত্রীক দেশত্যাগ করে তিনি ভারত প্রবেশ করেন। প্রয়োজনীয় চেকিং শেষে বেনাপোল স্থলবন্দরের ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা মোমিন উদ্দীন এবং বেনাপোল পোট থানা ওসি অপূব হাসান ৫২ সমাচারের নিকট লাবুর ভারতে প্রবেশের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তাঁরা বলেছেন, কুষ্টিয়ার কোর্টপাড়ার বাসিন্দা নুরুল হাসানের ছেলে আক্তারুজ্জামান লাবু বেলা ১১টা নাগাদ সীমান্ত অতিক্রম করেন। তাঁর পাসপোর্ট নম্বর-বিই ০২০৮৫৭৫ এবং ভিসার ধরন মাল্টিপুল।

লাবুর ছোট ভাই ওয়াহিদুজ্জামান লাইজু জানান, লাবু ফিরে এসেছে, সে ভালো আছে। তবে লাবুর ভারতে চলে যাওয়ার বিষয়ে তিনি অবগত নন বলেও দাবি করেন। একটি গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তাও লাবুর ভারতগমনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এদিকে, র‌্যাবের হাতে আটক হওয়ার পর নানা নাটকীতায় পাঁচদিন পর ফিরে কুষ্টিয়ায় নিজ বাড়িতে অবস্থান না করে তড়িঘড়ি ভারত চলে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে কুষ্টিয়ায় নানা জল্পনা-কল্পনা ও আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। তবে, এত্তোসব ঘটে চললেও লাবুর পরিবার এখনও মুখে কুলুপ এটে বসে আছে।

কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের এক শীর্ষ নেতা জানান, আইন-শৃংখলা বাহিনীর কাছ থেকে ছাড়া পাওয়ার আগে লাবুকে শর্ত দেয়া হয়েছিল আপাতত দেশে থাকাই যাবে না। তাকে দেশ ত্যাগ করে  ভারত বা অন্যত্র চলে যেতে হবে। আর এসব বিষয়ে সাংবাদিকসহ কারো কাছেই মুখ খোলা যাবে না। সেনুযায়ী কুষ্টিয়ায় ফিরেই নিজ বাড়িতে অবস্থান না করে সরাসরি যশোরে শ্বশুরালয় চলে যান লাবু। সেখানে একরাত যাপন শেষে বৃহস্পতিবারই চলে গেলেন ভারতে। অন্য সূত্র জানিয়েছে, আওয়ামী লীগের শীর্ষ কয়েকজন নেতার পরামর্শেই তিনি দেশ ছেড়েছেন। সেখানে কিছুদিন থেকে আবার দেশে ফিরবেন। ফেরার পর স্বেচ্ছাসেবক লীগের রাজনীতিতে লাবুকে আর দেখা নাও যেতে পারে বলে সূত্রটির দাবি।

কে এই লাবু-সবুজ: ছাত্র জীবনে ছাত্রলীগের একনিষ্ঠত কর্মী থেকে নেতায় পরিনত হওয়া লাবুর মাধ্যমেই ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতিতে ২০১০-১১ সালে অনুপ্রবেশ ঘটেছিল পুলিশ-র‌্যাবের শীর্ষ তালিকাভূক্ত পেশাদার সন্ত্রাসী ও চরম বিতকিত শেখ সাজ্জাদ হোসেন সবুজের। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তৎকালীন এক শীর্ষ পুলিশ অফিসার অভিযোগ করে বলেছেন, যাকে পুলিশ-র‌্যাব দীঘদিন ধরে হন্যে হয়ে খুঁজছিল অস্ত্র উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করতে গিয়ে ’বন্দুকযুদ্ধের’ জন্য। সেই ১৯৯৬-৯৭ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারামল থেকেই যে কিনা পুলিশের বিশেষ শাখার শীর্ষ তালিকাভুক্ত পেশাদার অপরাধী ও মাদক সম্রাট সেই সাজ্জাদ হোসেন সবুজকে লাবু সুবিধাভোগী ও সুযোগ সন্ধানী গুটিকয়েক জেলা আ’লীগের নেতার সরাসরি ইন্ধন এবং তত্বাবধানে হঠাৎই জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের মতো সহযোগি সংগঠনের সাধারণ সম্পাদকের পদ দিয়ে দলে অনুপ্রবেশের মধ্যদিয়ে জায়গা করে দেয়। মূলত: আ’লীগের “অ”ও না জানা সবুজকে শুধুমাত্র পুলিশ-র‌্যাবের কোপানল থেকে বাঁচাতেই তাঁর মতো ভয়ংকর অপরাধীকে দলে জায়গা দেয়ায় গোটা জেলায় আ’লীগের ইমেজও মারাত্মক ক্ষুন্ন হয়। এরপর থেকে তাঁদের আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। সরকারি দলের হয়ে নতুন করে ঢেলে সাজিয়ে জেলার অপরাধ জগৎ এর নিয়ন্ত্রন হাতে নিয়ে রাতারাতি বিপুল বিত্ত-বৈভবের মালিক বনে যায়। সরকারি সকল উন্নয়ন দপ্তর-অধিদপ্তরের টেন্ডার থেকে শুরু করে চাঁদাবাজি, নতুন করে পাড়া-মহল্লায় সন্ত্রাসী-মাস্তানদের গ্যাং গ্রুপ গড়ে তোলাসহ সরকারি দলটির ছত্রছায়ায় অপরাধ জগতের নয়া ”মুকুটহীন সম্রাটে” পরিনত হয়ে ব্যাপক নাম ফাঁটাতে শুরু করে এই সবুজ। অবৈধপন্থায় কামানো অঢেল টাকার একটা বড় অংশের ভাগ চলে যায় সরকারি দলটিতে অনুপ্রবেশ করানো ওই গডফাদার গোছের নেতাদের একাউন্টে-পকেটে। যদিও দলটির সকল স্তরের বড় অংশটি তাঁর মতো শীর্ষ তালিকাভুক্ত ও পেশাদার অপরাধী এবং মাদক সম্রাটকে বহিরাগত হিসেবে দলে জায়গা দেয়ার প্রচন্ড বিরোধীতা করাসহ মেনে না নিলেও কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফের ভয় এবং নাম ভাঙিয়ে প্রায় সকলের মুখ বন্ধ রাখতে বাধ্য করে। আর এভাবেই সব কিছুর একক নিয়ন্ত্রণ কর্তায় বনে গিয়ে গড়ে তোলা সম্রাজ্য ও বিপুল অথ-বিত্ত হালাল করতে গায়ে আবার ‘ব্যবসায়ী লেবেল’ আঁটতেই গত বছর কুষ্টিয়ার ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন চেম্বার অব কমার্সের কোন নির্বাচন ছাড়াই ভয়-ভীতি দেখিয়ে পাতানো খেলার ছকে বিন্দুমাত্র যোগ্যতা না থাকার পরেও সবুজকে সহ-সভাপতি পর্যন্তও মনোনীত করে তাঁর গডফাদাররা। এ সবের মধ্যদিয়ে আ’লীগসহ ব্যবসায়ী ও চেম্বারের সকল ঐতিহ্যভুলুন্ঠিত করে করা হয় কলন্কিতও।

দুই পরিবারেরই অভিযোগ, গত ২১ আগষ্ট গাজীপুরের শ্রীপুর থানার ড্রিম স্কয়ার রিসোর্ট থেকে র‌্যাব সদস্যরা জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি আক্তারুজ্জামান লাবু ও সাধারণ সম্পাদক আলেচিত সবুজকে ধরে নিয়ে যায়। পাঁচ দিন পর গত বুধবার দুপুরে হঠাৎ কুষ্টিয়ায় ফিরে আসেন লাবু। কিন্তু শুরু থেকেই লাবুর পরিবার সাংবাদিকদের নিকট তাঁর ফিরে আসার বিষয় নিয়ে লুকোচুরি শুরু করে। সাংবাদকর্মীদের মুখোমুখি যাতে হতে না হয় সেজন্য বুধবার রাতের আঁধারেই স্ত্রীকে সাথে নিয়ে লাবু সংগোপনে একটি সাদা প্রাইভেটকার নিয়ে শ্বশুড় বাড়ি যশোর চলে যান। শ্বশুরালয় নিরাপদ নয়, সেখানেও সাংবাদিকরা হাজির হতে পারে এ আশঙ্কা এবং র‌্যাবের কবল থেকে মুক্ত হতে দেয়া শর্তের পালন করতেই বৃহস্পতিবার দুপুরের দিকে যশোরের বেনাপোল চেকপোস্ট দিয়ে ভারতে পাঁড়ি জমানোর মধ্যদিয়ে আপাতত লাবু অধ্যায় শেষ। কিন্ত ”হইয়াও হইলো না শেষ” তাঁর সহযোগি ও সকল কাজে কাজী সবুজের বিষয়টি। তার ভাগ্যে আসলেই কি ঘটেছে বা ঘটতে যাচ্ছে তাও নিশ্চিত করে জানা ও বলা যাচ্ছে না। গ্রেপ্তার বা গুমের সপ্তাহ পেরোলেও সবুজের কোন সন্ধানই মিলছে না। তাকে নিয়ে নানা খবর পাওয়া যাচ্ছে। তবে কোন খবরেরই সত্যতা মিলছে না। সাংবাদিকরাও নানা বিবভ্রান্তিকর সব খবর পাচ্ছেন নানা সময়, নানা সুত্রে। বৃহস্পতিবার দিনভরই শোনা যাচ্ছিল সবুজকে নাকি আদালতে হাজির করা হচ্ছে। এ বিষয়ে র‌্যাব-১২ এর কমান্ডিং কার্যালয়ে যোগাযোগ করা হলে সেখানকার সূত্র বলছে, সবুজের খোঁজ চলছে। অপেক্ষা করুন, পরিস্থিতি হয়তো বা এমনও হতে পারে সে ভয়ন্কর কোন অপরাধ চক্রের কবলে পড়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সবুজকে জীবিত উদ্ধারে সব রকমের তৎপরতায় সচল থাকায় যে কোন সময় ওই চক্রের মুখোমুখি হলে গুলি ছুড়তে হতে পারে। তখন “বন্দুকযুদ্ধে”দেখা যাক কি ঘটে সবুজের ভাগ্যে?

ওদিকে, সবুজের স্ত্রী জিনিয়া জানান, বিভিন্ন সময় নানান খবর পাচ্ছি। এসব খবরে আশায় বুক বাঁধছি। তবে কোনটাতেই সত্যতা মিলছে না। দিতে না চাইলেও গুজবেই কান দিয়ে চলতে হচ্ছে। লাবু ও মনির যখন ফিরেছে তার স্বামীও ফিরবে বলে আশা মেয়েটির।

2015-08-29T18:44:52+00:00August 29th, 2015|কুষ্টিয়া|
Advertisment ad adsense adlogger