কুষ্টিয়ায় যুব প্রতিনিধিত্ব সৃষ্টির মাধ্যমে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তনে বাস্তবায়িত হচ্ছে এফরআই প্রকল্প

তৃণমূল পর্যায়ে যুব প্রতিনিধিত্ব বিষয়ে তরুণদের জ্ঞান বৃদ্ধি, দক্ষতা উন্নয়ন এবং দৃষ্টিভঙ্গীর ইতিবাচক পরিবর্তন সাধন, আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক কাঠামোতে যুবদের অন্তর্ভূক্ত করাসহ যুব সমাজের প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি ও শক্তিশালীকরণের লক্ষ্যে কাজ করছে একশন ফর ইম্প্যাক্ট প্রকল্প। দেশের ৬ টি জেলার মধ্যে কুষ্টিয়ায় আলো স্বেচ্ছাসেবী পল্লী উন্নয়ন সংস্থার মাধ্যমে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে। প্রকল্পের অন্যান্য জেলাগুলো হলো নীলফামারী, সাতক্ষিরা, বাগেরহাট, ঢাকা ও চট্টগ্রাম। প্রকল্পটিতে আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা প্রদান করছে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা একশনএইড। ২০১৮ সাল থেকে শুরু হওয়ার পর ইতোমধ্যে অত্র প্রকল্পের মাধ্যমে নতুন ১০টি যুব সংগঠন গঠন করা হয়েছে। প্রত্যেকটি যুব সংগঠনে ৩০ জন করে তরুণ কাজ করছে। সেই হিসেবে মোট ৩০০ জন তরুণ বর্তমানে অত্র প্রকল্পের মাধ্যমে নিজেদের জ্ঞান ও দক্ষতা উন্নয়ন এবং সামাজিক কার্যক্রমে নিজেদের অংশগ্রহণের সুযোগ পাচ্ছে। প্রকল্পের আওতায় তরুণদের নেতৃত্ব উন্নয়ন, সংগঠন উন্নয়ন, এডভোকেসি লবিং ও ক্যাম্পেইন, সিদ্ধান্ত গ্রহণ কাঠামোতে যুব প্রতিনিধিত্ব, মানবাধিকার ভিত্তিক প্রয়াস, অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র ও সামাজিক সম্প্রীতি, পরিকল্পনা-পর্যবেক্ষণ-মূল্যায়ন ও শিখন, ফ্যাসিলিটেশন ও কার্যকর যোগাযোগ, ট্রেনিং অব ট্রেনার, ফেমিনিজম ও সামাজিক জবাবদিহিতা, সামাজিক কর্মকান্ড ও স্বেচ্ছাসেবা, কোভিড-১৯ কালীন মানবিক সহায়তা ইত্যাদি বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়ে থাকে। স্থানীয় পর্যায়ে প্রশিক্ষণের পাশাপাশি জাতীয় পর্যায়ের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয় প্রকল্পের মাধ্যমে। প্রশিক্ষণগুলো সাধারণত সপ্তাহব্যাপী হয়ে থাকে এবং আবাসিক প্রশিক্ষণের সকল খরচ প্রকল্প থেকে বহন করা হয়। এ পর্যন্ত অত্র প্রকল্পের মাধ্যমে কুষ্টিয়া জেলার ২৮৭ জন তরুণ স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছে, ৭৯ জন বিভিন্ন কমিটিতে অন্তর্ভূক্ত হয়েছে, ২৫ জন বিভিন্ন স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের সাথে যুক্ত হয়েছে।

প্রকল্পটি শুরুর পর থেকে কুষ্টিয়া জেলার মিরপুর উপজেলার ফুলবাড়িয়া এবং চিথলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের স্ট্যান্ডিং কমিটিতে, ছাতিয়ান ইউনিয়নের দূর্গাপুর, ধলসা, নফরকান্দি কমিউনিটি ক্লিনিকের কমিটিসহ স্থানীয় বিভিন্ন ক্লাব ও বাজার কমিটির সিদ্ধান্তগ্রহণ কাঠামোতে যুবদের অন্তর্ভূক্ত করার বিষয়ে বর্তমান কাঠামোর সাথে তরুণ স্বেচ্ছাসেবকরা এডভোকেসি শুরু করে। যার প্রেক্ষিতে ফুলবাড়ীয়া ইউনিয়ন পরিষদের ১৩ টি স্ট্যান্ডিং কমিটিতে মোট ২৬ জন তরুণ এবং বিভিন্ন কমিউনিটি ক্লিনিকের সিদ্ধান্তগ্রহণ কাঠামোতে ২৪ জন তরুণ অন্তর্ভূক্ত হয়েছে।
ফুলবাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানসহ সকল সদস্যদের উপস্থিতিতে নবগঠিত যুব সংগঠন ইউনিক ইয়ুথ অর্গানাইজেশনের আয়োজনে কামিরহাট মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে ফুলবাড়ীয়া ইউনিয়নের সর্বস্তরের জনসাধারণের উপস্থিতিতে ছায়া ইউনিয়ন পরিষদ অধিবেশন আয়োজন করা হয় । এর উদ্দেশ্য ছিল স্থানীয় সিদ্ধান্তগ্রহণ কাঠামোতে যুবসমাজের প্রতিনিধিত্ব এবং সিদ্ধান্তগ্রহণে ভূমিকা রাখার সুযোগ বৃদ্ধি করা। ইউনিয়ন পরিষদের সেবাসমূহ প্রাপ্তি/গ্রহণের ক্ষেত্রে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা, সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুসারে ইউনিয়ন পরিষদের বাজেট প্রণয়ন প্রক্রিয়া, ইউনিয়ন পরিষদ কিভাবে পরিচালিত হয় এবং কোন কোন সেবাসমূহ প্রদান করা হয় তা জনসাধারণের সামনে তুলে ধরা।
শিক্ষার্থীদের একাডেমিক পড়াশোনার পাশাপাশি সামাজিক উন্নয়ন কর্মকান্ডে চিন্তার পরিসর বাড়াতে মিরপুর উপজেলার ২৩ টি স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা এবং আলো স্বেচ্ছাসেবী পল্লী উন্নয়ন সংস্থার স্বেচ্ছাসেবকগণের অংশগ্রহণে রচনা প্রতিযোগিতার আয়েজন করা হয়। উপজেলা শিক্ষা অফিসারসহ বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষক, সাংবাদিক, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিতে সেরা রচনা লেখকসহ প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী সকল শিক্ষার্থীদেরকে পুরষ্কার প্রদান করা হয়। সামাজিক সম্প্রীতি বিষয়ক জ্ঞান চর্চা বৃদ্ধির লক্ষ্যে মিরপুর উপজেলায় স্কুল পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সামাজিক সম্প্রীতি ও শান্তি বিষয়ক ইস্যুতে বিতর্ক প্রতিযোগিতা আয়োজন করা হয়, যেখানে মিরপুর উপজেলার ৪ টি স্কুলের শিক্ষার্থীরা বিতর্ক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে।

এই প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সরকারি-বেসরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ে যুবদের ভূমিকা শক্তিশালী করা যাতে ওইসব কার্যক্রমের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যুব জনগোষ্ঠীর মতামতের প্রতিফলন ঘটে এবং জবাবদিহিতার উন্নতি ঘটে। তারই ধারাবাহিকতায় ১০ টি যুব সংগঠনের তরুণ সদস্যদের নেতৃত্বে ইউএনও অফিসের সাথে যৌথভাবে টেকসই উন্নয়ন বিষয়ক সংলাপ আয়োজন করা হয়, যেখানে যুব সদস্যরা তাদের নিজেদের ভাবনাগুলো উপস্থাপন করে।
স্থানীয় গণতন্ত্রের উন্নয়নে স্থানীয় সরকারের ভূমিকাকে আরো শক্তিশালী করার লক্ষ্যে তরুণদের নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, পত্রিকার সম্পাদক, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী, কলেজ ও স্কুলের শিক্ষক, বিভিন্ন পত্রিকার সংবাদকর্মীদের সাথে স্থানীয় গণতন্ত্র মূল্যায়ন বিষয়ক জরিপের তথ্য উপস্থাপন এবং সংলাপ পরিচালনা করা হয়।
সমাজের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ও বিভিন্ন প্রজন্মের মানুষের মধ্যে বোঝাপড়ার সম্পর্ক শক্তিশালী করা এবং উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জনের জন্য সমাজের সবার মধ্যে শান্তিপূর্ণ সম্পর্কের প্রয়োজনীয়তার ব্যাপারে ঐকমত্য সৃষ্টি করার লক্ষ্যে আলো স্বেচ্ছাসেবী পল্লী উন্নয়ন সংস্থার তত্ত্বাবধানে সংগঠিত ১০ টি যুব সংগঠন ও কুষ্টিয়া জেলার স্থানীয় ০৩ টি যুব সংগঠন যৌথভাবে কুষ্টিয়ায় তরুণদের একটি প্ল্যাটফর্ম “কুষ্টিয়া যুব নেটওয়ার্ক” তৈরী করে। কুষ্টিয়া ইয়ুথ নেটওয়ার্কের তরুণদের নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক শান্তি দিবস উদযাপন করা হয়। এ কার্যক্রমের মাধ্যমে “শান্তির জন্য জলবায়ূ উদ্যোগ” এ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে জলবায়ূর পরিবর্তন কীভাবে বিশ^শান্তি ও স্থিতিশীলতার সাথে সম্পর্কিত এবং যুব জনগোষ্ঠী কীভাবে জলবায়ূর ক্ষতিকর পরিবর্তন পরিবর্তন রোধে সচেতনতা সৃষ্টি, জলবায়ূবান্ধব উন্নয়ন নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন, ইত্যাদি ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে, সেসব বিষয়ে আলোকপাত করা হয়। কোভিড-১৯ মোকাবিলায় এক্টিভিস্তা কুষ্টিয়ার সদস্যদের নেতৃত্বে, একশন এইড এর সহযোগিতায় কুষ্টিয়া সদর উপজেলা, ভেড়ামারা উপজেলা ও মিরপুর উপজেলার মোট ৯৩ টি অসহায় পরিবারের মাঝে খাবার ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রী বিতরণ করা হয়।

বিভিন্ন সামাজিক ইস্যুতে তরুণদের পদক্ষেপ বাস্তবায়নে স্বেচ্ছাসেবার পরিসর বাড়ানোর জন্য তারুণ্যের নেতৃত্বে স্বেচ্ছাসেবা ভিত্তিক অনলাইন প্লাটফরম “মানবতার সৈনিক” এবং “মানবিক সহায়তা তহবিল” গঠন এবং কুষ্টিয়া ইয়ুথ নেটওয়ার্ক ও এক্টিভিস্তা কুষ্টিয়ার সদস্যদের উদ্যোগে সর্বস্তরের মানুষের সহযোগিতায় ফান্ড সংগ্রহ এবং কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে ও ঈদ উপলক্ষ্যে ৪০ টি দুঃস্থ পরিবারের মাঝে পোলাও চাল ও মাংসসহ ঈদ বাজার বিতরণ করা হয়।
কোভিড-১৯ মোকাবিলায় সর্বস্তরের মানুুষের জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ১০ টি যুব সংগঠনের তরুণ এক্টিভিস্তা সদস্যরা কুষ্টিয়া সদর, ভেড়ামারা পৌরসভা এবং মিরপুর উপজেলার মিরপুর পৌরসভা, চিথলিয়া, ছাতিয়ান, ধুবইল এবং ফুলবাড়িয়া ইউপি’র বিভিন্ন জনাকীর্ণ স্থানে জীবানুনাশক স্প্রে, ওয়াশিং পয়েন্ট ও সচেতনতা বার্তাসহ ফেস্টুন স্থাপন, স্থানীয় বাজারগুলোতে নিরাপদ দুরত্ব বজায় রেখে গোল বৃত্ত অংকনসহ নানামূখী কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে।
তরুণদের নেতৃত্বে কোভিড-১৯ প্রতিরোধে সচেতনতা বৃদ্ধিমূলক অনলাইন ভিত্তিক প্রচারাভিযান পরিচালনা চলমান রাখার জন্য অনলাইন ক্যাম্পেইন ডিজাইন বিষয়ে তরুণদের দক্ষতা উন্নয়নে “অনলাইন ক্যাম্পেইন বিষয়ক কর্মশালা” আয়োজন করা হয়। কোভিড-১৯ মহামারী পরিস্থিতে বর্তমান স্থানীয় চিত্র অনুসন্ধানে কুষ্টিয়া জেলার ৬ টি উপজেলার মানুষের মাঝে অনলাইন জরিপ পরিচালনা করা হয় এবং উক্ত জরিপের খসড়া তথ্য ও সুপারিশসমূহ নিয়ে উপজেলা প্রসাশন ও ইউনিয়ন পরিষদের সাথে সাংবাদিক, সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও ৮ টি যুব সংগঠনের প্রতিনিধিদের মধ্যে “কোভিড-১৯ এর প্রভাব এবং আমাদের করণীয় শীর্ষক ২ টি আলোচনা সভা করা হয়। এতে উপজেলা প্রসাশন ও ইউনিয়ন পরিষদের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা তরুণদের উদ্যোগকে সাদুবাদ জানান এবং কোভিড-১৯ মোকাবিলায় নিজ নিজ দপ্তরের পক্ষ থেকে সর্বাত্নক সহযোগিতা ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহন জোরদার করার ব্যাপারে তরুণদের নিকট প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হন।
অত্র প্রকল্পের মাধ্যমে ভবিষ্যতে তারুণ্যের নেতৃত্বে করোনাভাইরাস মোকাবিলায় জনসচেতনতা বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন অব্যহত থাকবে।

2020-07-03T10:59:43+00:00July 1st, 2020|কুষ্টিয়া|
Advertisment ad adsense adlogger