রাজউকের অসাধু কর্মকর্তাদের কীর্তি টাকা দিলেই হেলে পড়া ভবন ঝুঁকিমুক্ত!

কুষ্টিয়া নিউজ ডেস্ক ॥হেলে পড়া ঝুঁকিপূর্ণ ভবনকে স্বাভাবিকভাবে ব্যবহারের জন্য অনুমতি দিয়ে যাচ্ছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। গত পাঁচ বছরের ব্যবধানে রাজধানীতে অর্ধশতাধিক ভবন হেলে পড়লেও দুটি ছাড়া বাকিগুলোতে চলছে স্বাভাবিক কার্যক্রম। এর মধ্যে একটি বেশ প্রাচীন। অন্যটির বিপরীতে ভবন মালিকের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের উৎকোচ আদায় করেছেন রাজউকের অসাধু কর্মকর্তারা। তারা ওই ভবন মালিককে আশ্বাস দিয়েছেন, শিগগিরই অনুমতি পেয়ে যাবেন। ভবন মালিকেরও ধারণা, কিছুদিনের মধ্যে তিনি ভবনে ভাড়াটিয়া তুলতে পারবেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ওইসব ভবনের বাসিন্দারা ব্যাপক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। যে কোনো মুহূর্তে মাঝারি মানের ভূমিকম্প ঘটলেই সেগুলো ধসে প্রাণহানি ঘটতে পারে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ও নগর পরিকল্পনাবিদ ইসরাত ইসলাম সমকালকে বলেন, একটি ভবন হেলে পড়ার পর সেটি নিয়ে আলোচনা হয়। তখন রাজউক সিলগালা করে বাসিন্দাদের সরিয়ে নেয়। এরপর কেউ ওই ভবনের খোঁজ নেন না। হয়তো কোনো ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই সেই সুযোগে ভবন মালিক ও রাজউকের অসাধু কর্মকর্তারা যোগসাজশ করে ভবনে ভাড়াটিয়াদের তুলে দেন। এতে করে ঝুঁকির মাত্রা বাড়ছে। বাংলাদেশে মাঝে মধ্যেই কম মাত্রার ভূমিকম্প হচ্ছে। সেই সঙ্গে প্রায় প্রতিবারই ভূমিকম্পের পর বিভিন্ন স্থানে ভবন হেলে পড়ার ঘটনা ঘটছে। সর্বশেষ গত ১৩ এপ্রিল সংঘটিত ভূমিকম্পের পর রাজধানীর কদমতলীতে একটি চারতলা ভবন হেলে পড়ার ঘটনা ঘটে। পরে রাজউক বাসিন্দাদের সরিয়ে দিয়ে ভবনটি সিলগালা করে দেয়। অতীতে এ ধরনের হেলে পড়া ভবনগুলোর ক্ষেত্রে দেখা গেছে, কিছুদিন পরই আবার সেগুলোকে লিখিত বা অলিখিতভাবে ব্যবহারের অনুমতি দিয়ে দিচ্ছে রাজউক। এই সুযোগে ভবন মালিকের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন অসাধু কর্মকর্তারা। মাঝারি বা বড় মাত্রার ভূমিকম্প হলে এসব ভবন ধসে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের। রাজউকের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আবদুর রহমান সমকালের কাছে এসব বিষয় স্বীকার করে বলেন, এ ধরনের ভবন ও মালিকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান থাকলেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা কখনও নেওয়া হয়নি। এখন সময় এসেছে ব্যবস্থা নেওয়ার। কারণ, এভাবে চলতে থাকলে সব কিছু নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। তিনি আরও বলেন, কোনো ভবন হেলে পড়লে রাজউক দেখবে সেটা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ। বসবাসের অনুপযোগী হলে সেটা ভেঙে ফেলবে। আবার অনুমোদন ছাড়া তৈরি করলে ভবন মালিককে জেল-জরিমানা দেওয়ারও বিধান রয়েছে। অথচ এ ধরনের দণ্ড দেওয়ার কোনো নজির রাজউক স্থাপন করতে পারেনি। দু’একজনকে শাস্তি দিলে নকশাবহির্ভূত বা ইমারত নির্মাণ বিধিমালা অমান্য করার প্রবণতা কমবে। রানা প্লাজা বা স্পেকট্রাম ট্র্যাজেডির মতো ঘটনা থেকেও রেহাই পাওয়া যাবে। রাজউকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত পাঁচ-ছয় বছরের ব্যবধানে রাজধানীতে প্রায় অর্ধশতাধিক ভবন হেলে পড়ার খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এসব ভবনের মধ্যে সব ক’টিকেই স্বাভাবিক ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে রাজউক। সর্বশেষ আটটি ভবনের অনুমতি দেওয়ার ব্যাপারে গড়িমসি করেছিল। সেগুলোরও একটি ছাড়া সাতটিতে এখন চলছে স্বাভাবিক কার্যক্রম। এর মধ্যে একটি ভবনের ওপরের দিক থেকে একটি তলা, আরেকটির দুটি তলা ও অন্যটির তিনটি তলা ভেঙে ফেলে ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এতে প্রশ্ন উঠেছে, ওপর থেকে তলাগুলো ভেঙে ফেললেই কি ভবনটি ঝুঁকিমুক্ত হয়ে যাবে, নাকি ভবনটি আরও দুর্বল হয়ে পড়বে।

এ প্রসঙ্গে স্থাপত্য অধিদপ্তরের সাবেক প্রধান স্থপতি আহসানুল হক খান বলেন, ‘হেলে পড়া ভবনের ওপর থেকে দুই-তিন তলা ভেঙে ফেললেই যে ভবনটি ব্যবহার উপযোগী হয়ে যাবে এমন কোনো প্রকৌশল বিষয় আছে বলে আমার জানা নেই। এতে বরং ঝুঁকি বাড়াটাই স্বাভাবিক। সরেজমিন চিত্র :এ রকমই একটি ২৪৯/১ বংশাল রোডের ছয়তলা ভবনটিতে গিয়ে দেখা যায়, ওপর তলা থেকে দুটি তলা ভেঙে প্রতিটি তলাই বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বাড়ির মালিক আবদুল গফুর ভবনটিতে থাকেন না। অন্য তলাগুলো তিনি ভাড়া দিয়েছেন। দোতলায় গিয়ে দেখা যায়, সেখানে ছোট গার্মেন্টে পোশাক তৈরি করছেন ১০-১৫ জন শ্রমিক। নাঈম নামে এক যুবক জানান, তারা মাসিক ১২ হাজার টাকায় ওইতলা ভাড়া নিয়ে টেইলার্সের ব্যবসা করছেন। তৃতীয় তলায়ও একই ব্যবসা চলছে। এ তলার ভাড়াটিয়া উজ্জ্বল জানান, ভবন মালিক তাদের জানিয়েছেন, ভবনটি কিছুটা হেলে পড়লেও বসবাসে কোনো সমস্যা নেই। ভাড়াটিয়াদের কাছে গফুর মিয়ার ফোন নম্বর জানতে চাইলে তারা দিতে রাজি হননি। তবে পার্শ্ববর্তী একটি ভবনের মালিক জানান, দুই বছর আগে ভবনটি হেলে পড়ার পর রাজউক সেটি সিলগালা করে দিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে গফুর মিয়া রাজউকের কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে ব্যবহারের সুযোগ করে নেন। অসচেতন লোকজন তলাগুলো ভাড়াও নিয়েছেন। মাঝে মধ্যেই রাজউকের লোকজন গিয়ে গফুর মিয়ার কাছ থেকে টাকা নিয়ে আসেন। সরেজমিন দেখা যায়, ভবনটির উত্তর পাশে আরেকটি ছয়তলা ভবনের প্রায় গা ঘেঁষে হেলে আছে। নিচের দিকে দুটি ভবনের মাঝে কয়েক ফুট ব্যবধান থাকলেও ওপরের দিকে এই ব্যবধান মাত্র কয়েক ইঞ্চি। সরেজমিন মিরপুর ১২ নম্বরের ডি ব্লকের ২/এ নম্বর সড়কের ২৮ নম্বর প্লটে গিয়ে দেখা যায় পাঁচতলা ভবনটি অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। পশ্চিম দিকে হেলে থাকা ভবনটির মালিক আবদুল মান্নান ওরফে মান্নান মাস্টার বর্তমানে থাকেন মোহাম্মদপুর এলাকায়। ফোনে তিনি দাবি করেন, নির্মাণের সময়েই কিছুটা হেলে তৈরি হয়েছিল। আশপাশের কিছু লোক শত্রুতা করে গুজব ছড়িয়ে রাজউক, ফায়ার সার্ভিসের লোক ডেকে এনে তালিকাভুক্ত করেছে। রাজউক যাতে ভবনটি ব্যবহারের অনুমতি দেয়, এ জন্য তিনি ওপর থেকে একটি তলা ভেঙে ফেলতেও রাজি হয়েছেন। রাজউকও তাতে সম্মতি দিয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও মান্নান মাস্টারের ঘনিষ্ঠ একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কিছুদিন আগেও রাজউকের লোকজন এসে মাস্টারের কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা নিয়ে গেছেন। তার সামনেই মাস্টার টাকা দিয়েছেন। কারণ, এখন ভাড়া দিলেও মাসে ৬০-৭০ হাজার টাকা ভাড়া পাওয়া যাবে। একই অবস্থা পাওয়া গেছে যাত্রাবাড়ীর ধলপুর এলাকার ৩৫/৫ লিচুবাগান গলির সাততলা ভবনের ক্ষেত্রেও। এ ক্ষেত্রে রাজউক ওপরের তিনটি তলা ভেঙে ফেলে ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে। অন্যদিকে বছরখানেক আগে মুগদার ১০৪ উত্তর মাণ্ডার ছয়তলা ভবনটিতেও বর্তমানে চলছে স্বাভাবিক কার্যক্রম। হেলে পড়ার পর রাজউক সেটি সিলগালা করে দিলেও কয়েক মাস আগে রাজউকের লোকজন ভবনটিতে বসবাসের সুযোগ করে দেন। রাজউক জানিয়ে দেয় ছাদের ফাটলটি অবকাঠামোগতভাবে কোনো সমস্যা নয়। এ ক্ষেত্রেও ভবন মালিকের সঙ্গে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে।একমাত্র মিরপুরের মাজার রোডের দ্বিতীয় কলোনির ৫/বি/এ নম্বর হোল্ডিংয়ের পাঁচতলা ডায়মন্ড সোয়েটার ইন্ডাস্ট্রিজকে ব্যবহারের অনুমতি দেয়নি রাজউক। এ ক্ষেত্রে রাজউক বলেছে, ভবনটি পুরনো। গত ১৯ এপ্রিল কদমতলীতে হেলে পড়া একটি ভবন সিলগালা অবস্থায় রয়েছে।আরও যেসব ভবনকে অনুমতি দেওয়া হয়েছে :২০১৫ সালের ২৫ এপ্রিল ভূমিকম্পের পর ১৫টি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর মধ্যে ৯টি ভবন হেলে পড়ে। এর মধ্যে মোহাম্মদপুরের ২৩/৩, খিলজি রোডে আশা টাওয়ার, বনানীর ইফাদ টাওয়ার, এফআর টাওয়ার, বনানীর ১৭ নম্বর সড়কের ২৭ নম্বর বাড়ি, মিরপুরের ডায়মন্ড গার্মেন্টও ছিল। ২০১০ সালের ৫ জুন ১৬৯/১ শান্তিনগরে ২২তলা ভবন হেলে পড়ে। ওই বাড়ির বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়া হলেও কিছুদিন পরই আবার বসবাসের সুযোগ করে দেওয়া হয়। ওই দিনই দয়াগঞ্জের ৩৭/কেবি রোডের বাড়িটি হেলে পড়ে। ২০১০ সালের ১ জুন ৪০/এ/৭ বেগুনবাড়িতে একটি সাততলা ভবন হেলে পড়ে। এর তিন দিন আগে মধ্য বেগুনবাড়ির ১৮/বি পাঁচতলা বাড়িটি পিলারসহ উপড়ে পাশের চারটি তিনতলা টিনশেড বাড়ির ওপর পড়লে নারী-শিশুসহ ২৫ জনের মৃত্যু হয়।

2016-04-24T23:02:39+00:00April 24th, 2016|অন্যান্য|
Advertisment ad adsense adlogger