কেনাকাটার পালা প্রায় শেষ। প্রচণ্ড দুর্ভোগ হবে জেনে এবং নিরুপায় হয়ে তা সহ্য করে রাজধানী থেকে নিজ গ্রামের বাড়িতে যাত্রা চলছে ঘরমুখী মানুষের। পবিত্র জুমাতুল বিদাও সম্পন্ন হলো ২৩ জুন। এখন অপেক্ষা শুধু মাহেন্দ্র ক্ষণটির জন্য। তবে তা এখনো নিশ্চিত করে বলার উপায় নেই, কবে আকাশের কোণে উঠবে শাওয়াল মাসের কাস্তের মতো একফালি সরু বাঁকা চাঁদ। আপাতত এটুকুই বলার, পবিত্র ঈদুল ফিতর সমাগত।

দেশের মুসলিম সম্প্রদায়ের ঘরে ঘরে অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতর উদ্‌যাপন নিয়ে এখন চলছে মধুর প্রতীক্ষা। রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের সওগাত নিয়ে আসা অত্যন্ত ফজিলতময় রমজান মাস বিদায়ের পথে। শাওয়ালের চাঁদ দেখা সাপেক্ষে নির্ভর করবে রোজা ২৯, নাকি ৩০টি পূর্ণ হবে। একই সঙ্গে নির্ধারিত হবে ঈদ কবে হবে—২৬ জুন সোমবার, না ২৭ জুন মঙ্গলবার।

এবার ঈদ হচ্ছে ঘোরতর বর্ষাকালে। সে কারণে বৃষ্টি না হলে গা-জ্বালানো ভ্যাপসা গরম। আবার বৃষ্টি নামলে কাদাপানির দুর্ভোগ। ঢাকার সড়কগুলোর অবস্থা এখন অবর্ণনীয় খারাপ পর্যায়ে। কোথাও উড়ালসড়ক নির্মাণের অন্তবিহীন কর্মযজ্ঞ, তো কোথাও ভূগর্ভস্থ পাইপ বসানোর খনন কর্ম। তার ওপর নিষ্কাশনব্যবস্থা একেবারে বেহাল। একপশলা মাঝারি বৃষ্টিতেও এখন ঢাকার বহু অভিজাত এলাকায় হাঁটুপানির ঘোলা স্রোত। জলমগ্ন খানাখন্দে পড়ে যানবাহন উল্টে যায়, লোকের পা ভাঙে। অনেক সময় প্রাণও যায়। পানিতে ডুবে থাকা ইলেকট্রিক তারে জড়িয়ে যায় মানুষ। বহু বছর থেকে এই প্রক্রিয়া চলছে। মনে হয় এর কোনো প্রতিকার নেই। এই উন্নয়ন এখন ক্যানসারের মতো ভোগাচ্ছে জনসাধারণকে।

তবু এর মধ্যেই চলছে কেনাকাটার পালা। আর ঈদের কেনাকাটা তো এক-দুদিনে শেষ হওয়ার নয়। তাই শেষ মুহূর্তেও রাজধানী ঢাকার ফুটপাতের পসরা থেকে অভিজাত বিপণিবিতানগুলোতে বিপুল ব্যস্ততা। বিশেষ করে যাঁরা ঢাকাতেই ঈদ করবেন, তাঁরা চাঁদরাত পর্যন্ত কেনাকাটার সুযোগ পাবেন। সে কারণে এখনো গভীর রাত পর্যন্ত আলো ঝলমল করছে বিপণিবিতানগুলো। পথে পথে হরেক রকমের যানবাহনের জটলা। নতুন কেনা জামাকাপড়ের ব্যাগ হাতে ছুটছেন নাগরিক ক্রেতার ঝাঁক। বোঝা যায় দেশের অন্যান্য শহরের পরিবেশও কমবেশি একই রকম।

ঈদে আনন্দ আর দুর্ভোগ এখানে যেন অনেকটা হাত ধরাধরি করে চলে। কেনাকাটা করতে ভোগান্তি আছে। এর চেয়েও বেশি ভোগান্তি গ্রামের বাড়িতে ফিরতে। ঢাকা বা বড় শহরগুলোর অধিকাংশ চাকরিজীবী মানুষ আসেন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে। বছরের এই প্রধান আনন্দ উৎসবের দিনগুলোতে স্বাভাবিকভাবেই মানুষ চায় আপনজনের সান্নিধ্য। সে কারণেই রাজধানী থেকে বিভিন্ন দিকে শুরু হয় অগণিত মানুষের ছুটে চলা।

প্রতিবছর ঈদের যাত্রা যে হবে অবর্ণনীয় দুর্ভোগময়, তা যেন গণমানুষের জীবনে অলঙ্ঘনীয় নিয়তিতে পরিণত হয়েছে। প্রতিবছরই বলা হয়, ঈদের যাত্রা নির্বিঘ্ন করার জন্য ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আর প্রতিবছরই মানুষ সেই একই রকম দুর্ভোগে পড়েন পথের অব্যবস্থাপনা নিয়ে। আর তার পরে সাফাই দেওয়া হয় অনেক বেশি যানবাহন পথে নেমেছে, ইত্যাদি ইত্যাদি। এ বছরও বাস্তবে তা-ই হয়েছে। এমনকি পুরো বঙ্গবন্ধু সেতু যানজটে স্থবির হয়ে পড়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে। সন্দেহ নেই এরও কোনো যুক্তি ব্যাখ্যা দাঁড় করানো হবে। কিন্তু আগে থেকে এসব সম্ভাব্য অসুবিধা দূর করার কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয় না—এটাই বাস্তবতা। সেই বাস্তবতা মেনেই চলছে ঈদের যাত্রা। তারপরও দিনের শেষে আপনজনকে কাছে পাওয়া, জন্মস্থানে ফিরে যাওয়া, সেখানকার আলো-হাওয়ার স্পর্শ পাওয়া এবং ছেড়ে যাওয়া আপনজনের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে অশ্রুসিক্ত দুই হাত তোলা—এই তো, এসব নিয়েই ঈদের আনন্দ-বেদনার মহাকাব্য।