বিশেষ প্রতিবেদন: সৃজনশীল পদ্ধতিতে পাঠদান শিক্ষাক্ষেত্রে একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের বেশির ভাগ বিষয়ই বর্তমানে সৃজনশীল পদ্ধতিতে পাঠদান করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বই থেকে পড়া মুখস্থ করার প্রবণতা কমে গিয়েছে। নিঃসন্দেহে এটি সরকারের ভালো একটি প্রচেষ্টা । শিক্ষকরা পর্যায়ক্রমে সৃজনশীল পদ্ধতিতে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করছেন এবং এই পদ্ধতি অনুসরন করেই শিক্ষার্থীদের পাঠদান করছেন। সৃজনশীল পদ্ধতিতে একজন শিক্ষার্থীকে পাঠ্য পুস্তুকের উপর খুববেশি নির্ভরশীল হতে হয় না। একজন শিক্ষক পাঠদানের ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের উপর নিজের সৃজনশীলতাকে কাজে লাগান। একইভাবে শিক্ষার্থীও তার মেধাকে সৃজনশীল জ্ঞানের মাধ্যমে বিকশিত করে। সৃজনশীল পদ্ধতিতে উদ্দীপক শব্দটি বিশেষভাবে পরিচিত। উদ্দীপকের বিশ্লেষণ পূবর্ক একজন শিক্ষার্থী প্রশ্নের উত্তর তৈরি করে। শিক্ষার্থী খুব ঠান্ডা মাথায় চিন্তাভাবনা করে প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করে। আপাত: দৃষ্টিতে কাজটি আসলে খুব সহজ অথবা খুব কঠিন। অর্থাৎ এ পদ্ধতিতে ভালো ফলাফল করা যেমন সহজ তেমন ফেল করাও সহজ।

একজন শিক্ষার্থী যদি সৃজনশীল পদ্ধতিতে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত শিক্ষকের ক্লাশে নিয়মিত উপস্থিত থাকে, তাহলে তার ভালো ফলাফলের কাজটি সহজ হয়ে যাবে। উচ্চ মাধ্যমিক বিজ্ঞান বিভাগের একজন শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষা শেষ করার সাথে সাথেই উচ্চ মাধ্যমিকের বিষয়গুলি পড়া শুরু করে। নিঃসন্দেহে ভালো উদ্যোগ। প্রাইভেট স্যারদেরও উপকার হয় শিক্ষার্থীদেরও উপকার হয়। কি আর করা, এসএসসি পরীক্ষা দিয়েই তো আর কলেজে ভর্তি হওয়া যায় না, ফলাফল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। বিজ্ঞানের একজন শিক্ষার্থী পদার্থ, রসায়ন, গণিত, জীববিজ্ঞান, আইসিটি, ইংরেজী, বাংলা এই সাতটি বিষয়ে অন্যের প্রতি নির্ভরশীল হয়ে থাকে। অর্থাৎ সাতটি বিষয়েই তাকে প্রাইভেট পড়তে হয়। অভিভাবকরা তাদের সন্তানকে প্রাইভেট না পড়ালে হতাশাগ্রস্থ হয়ে পরেন। আসলে প্রত্যেক বাবা মা-ই তার সন্তানের ভালো চান । আমি ধরে নিচ্ছি আপনি একজন সচেতন অভিভাবক। তাই আপনার সন্তান নিয়মিত সকাল ৯টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ক্লাশ করে। ক্লাশ শুরু হওয়ার আগে তিনজন শিক্ষকের কাছে প্রাইভেট পড়ে এবং ক্লাশ শেষে আরও দুই অথবা তিনজন শিক্ষকের কাছে প্রাইভেট পড়ে। বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী, প্রাইভেট ছাড়া যে জীবন অচল !

সম্মানিত অভিভাবক, আপনার সন্তান প্রাইভেট এবং কলেজ শেষে সন্ধ্যায় যখন বাসায় ফিরে, তখন কি তার চেহারা দেখে আপনাদের দৃষ্টিতে তাকে সচল মনে হয় ? যদি সচল মনে হয় তাহলে তাকে আরও কয়েকটি শিক্ষকের নিকট প্রাইভেট পড়তে দিতে পারেন। লেখাপড়া করা খুব পরিশ্রমের কাজ। সরাদিন আপনার সন্তান বিভিন্ন শিক্ষকের কাছে বিভিন্ন বিষয় প্রাইভেট পড়ে এসে ক্লান্ত শরিরে ঘুম ঘুম চোখে বাসার পড়ার টেবিলে না বসলে আপনার কষ্ট লাগে । একবার নিজেকে দিয়ে ভাবুন না ! এই ক্লান্ত শরিরে রাতে টেবিলে পড়তে বসা কতটুকু সম্ভব ! এর পরও আমাদের সন্তানেরা পড়তে বসে, কারণ এখন সৃজনশীল পদ্ধতির প্রতিযোগিতার যুগ। যন্ত্র যদি চলতে পারে আমাদের সন্তানরা পারবেনা কেন ? তাছাড়া অভিভাবকদের অনেকের মধ্যে মেলামেশা করতে হয়। অফিসের সহকর্মীদের সাথে সন্তানের লেখাপড়ার ব্যাপারে কথাবার্তা হয়। কারও সন্তান যদি মাত্র চারটি প্রাইভেট পড়ে তাহলে তার মাথা নিচু হয়ে যায়। তাই মাথা নিচু করার প্রশ্নই আসেনা, আপনার সন্তানকে সবকয়টি বিষয়েই প্রাইভেট পড়তে হবে। এই মনোবল নিয়েই আমরা সন্তানদের লেখাপড়া চালিয়ে যাচ্ছি। আপনার সন্তানের মেধা কোন বিষয়ের প্রতি বেশি কাজ করে তা কি কখনও অনুধাবন করার চেষ্ঠা করেছেন ? আমার মনে হয় দুনিয়াতে সবচেয়ে বড় শিক্ষক বাব-মা এবং সবচেয়ে ভালো বন্ধুও বাবা-মা। কিন্তু আমরা অধিকাংশ অভিভাবকই তা ভুলে যায়।

আপনার সন্তানকে যদি জীববিজ্ঞান, বাংলা, ইত্যাদি বিষয়গুলিতেও প্রাইভেট পড়তে হয়, তাহলে তার বিজ্ঞান বিভাগে না পড়াটাই মনে হয় ভালো ছিল। তার নিজের আত্মঃবিশ্বাস নেই বললেই চলে। সন্তানকে আত্মঃবিশ্বাসী করে গড়ে তোলা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। আমরাতো সন্তানদের ভাত মাখিয়ে দিচ্ছি। তাকে অন্তত: নিজে হাতে খাওয়াটা অভ্যাস করানো উচিত। ভেবেদেখুন, আমাদের (অভিভাবকদের) অবর্তমানে কে তাকে মুখে তুলে ভাত খাইয়ে দিবে। তাকে একটু বিশ্রাম নেয়ার সুযোগ দিন। তার চিন্তাশক্তিকে কাজে লাগানোর সুযোগ দিন। প্রতিযোগিতাপূর্ন মনোভাব থেকে বেরিয়ে এসে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিন। নিয়মিত ক্লাশ করতে উদ্বুদ্ধ করুন। প্রাইভেট পড়ার প্রতি নিরুৎসাহিত করুন। তার নিজের প্রতি আস্থা অর্জন করতে শেখান। আত্মঃবিশ্বাসী হওয়া ও সিদ্ধান্ত গ্রহনের সুযোগ দিন। ভালো এবং মন্দের পার্থক্য উপলদ্ধি করতে শেখান।

আপনার সন্তান যদি ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, আইনজীবী, শিক্ষক, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, ব্যাংক কমকর্তা, অথবা রাজনীতিবিদ হতে চাই তাহলে তার ইচ্ছার প্রাধন্য দিন। দয়াকরে জোর করে কোন কিছু চাপিয়ে দিবেন না। এতে হিতের বিপরিত ঘটে। রাজনীতিবিদ হতে চাইলে তাকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, আইন ইত্যাদি বিষয়ের উপর পড়াশোনার জন্য উৎসাহ দিন। একজন জ্ঞানী রাজনীতিবিদের সমাজে কতটুকু অভাব তা নিশ্চয় আমরা হাড়ে হাড়ে উপলদ্ধি করি। একজন প্রকৃত রাজনীতিবিদের সৃজনশীল জ্ঞান থাকা আবশ্যক।

মোঃ মোস্তাফিজুর রহমান (শামীম)
সদস্য, বাংলাদেশ ইংলিশ ল্যাঙ্গুয়েজ টির্চাস এ্যাসোসিয়েশন
প্রভাষক, ইংরেজি বিভাগ
ভেড়ামারা কলেজ
কুষ্টিয়া।