অভিভাবকরা সন্তানদের ওপর নজরদারি কতটা বাড়িয়েছেন

বাংলাদেশে গুলশান ও শোলাকিয়া হামলার পর সন্তানদের দিকে আরও দৃষ্টি দেওয়া বা নজরদারি বাড়ানোর কথা বলা হচ্ছে বিভিন্ন মহল থেকে।

অনেক অভিভাবক বলছেন পরিবারের মধ্যে তারা ইতোমধ্যেই অনেক বেশি সতর্ক হয়ে ওঠেছেন।

আবার প্রশ্ন উঠছে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে বা মেসে থাকা অসংখ্য শিক্ষার্থীর ওপর নজরদারি কীভাবে সম্ভব?

শিক্ষার্থীরা কেউ কেউ বলছেন অতিরিক্ত নজরদারি তাদের বিরক্তও করে তুলতে পারে।

একজন সমাজবিজ্ঞানী বলছেন বন্ধুত্বের মধ্য দিয়ে নজরদারি হলে সেটি ইতিবাচকই হবে সন্তানদের জন্য।

ঢাকার গুলশানে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ হামলার সাথে জড়িত তরুণদের পরিচয় জানার পর সবমহলেই রীতিমত উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের নিয়ে।

বলা হচ্ছে শুধু বাইরেই নয়, ঘরেও সন্তান কী করছে সেদিকে দৃষ্টি বা নজরদারি বাড়াতে হবে অভিভাবকদের। ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থীর মা বলছিলেন তার উদ্বেগের কথা।

তিনি বলেন, “ভার্সিটি যাওয়ার সময় বলি। মাঝে মধ্যে যাই আমরা। খোঁজ খবর রাখি কতটুকু ক্লাস করে বা না করে। যতক্ষণ সে না ঘুমায় ততক্ষণ আমার মধ্যে টেনশন কাজ করে”।

এতো খোঁজখবরে সন্তানের মধ্যে বিরক্তি দেখেননি বলে জানান তিনি।

কেউ কেউ আবার সন্তানকে না জানিয়েও খোঁজ নিচ্ছেন তার সন্তান কোথায় যায় বা কী করে, যেমনটি বলছিলেন পুরনো ঢাকার শাহিদা রহমান, যার এক সন্তান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেকজন তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থী।

তিনি বলেন, “আমার ছেলে কোথায় যায় কার সাথে মিশে। গোপনে তার বন্ধুদের ঠিকানা নিয়েছি। গুলশানের ঘটনার পরেও খোঁজ নিয়েছি আমার ছেলে কোথায় যায়। ইউনিভার্সিটিতেই আড্ডা দেয়, আর কোথাও যায় না সে, এটা আমি জেনেছি অন্যদের কাছ থেকে, তাকে না জানিয়েই”।

চলচ্চিত্র নির্মাতা ও লেখক শাকুর মজিদের সন্তান ঢাকার বেসরকারি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। তার কাছে জানতে চেয়েছিলাম সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের পর সন্তানের ওপর নজরদারি বাড়ানোর প্রয়োজন মনে করছেন কিনা?

তিনি বলেন, “আমার সন্তানদের সাথে এ ঘটনার আগে যেমন নজরদারি ছিলে তা থেকে পরিবর্তন হয়নি। আগে থেকেই তাদের ওপর নজরদারি আছে আমার। আমি জানি তারা কোথায় যায় বা কী করে। কিন্তু সামগ্রিকভাবে একটি আতঙ্ক রয়েছে যার সাথে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বিষয় জড়িত”।

তবে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ড. হোসনে আরা বলছেন বহু শিক্ষার্থী পরিবারের বাইরে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে কিংবা মেসে থেকে পড়াশোনা করে। তারাও যেন বিপথে না যায় সেদিকেও দৃষ্টি দিতে হবে।

তিনি বলেন, “যারা হল বা মেসে থাকে তারা শ্রেণীকক্ষে আছে কী-না তা শিক্ষককে নিশ্চিত করতে হবে। আমিও আমার বিভাগে বসব যে এটা নিয়ে কী করতে পারি। আগে স্বাধীন রাজনৈতিক চর্চা ছিলো। আমাদের ছেলে মেয়েরা সেটা করতে পারছে না। ছাত্র সংসদ, সাহিত্য সংসদ বিভিন্ন ক্লাব—অর্থাৎ শুধু শ্রেণীকক্ষ নয়, বাইরেও তাদের সম্পৃক্ত করতে হবে”।

কিন্তু এতো উদ্বেগ বা নজরদারি শিক্ষার্থীরা কিভাবে দেখছে এমন প্রশ্নের জবাবে একজন শিক্ষার্থী বলেন বাবা মা খোঁজ নিচ্ছে এটা খুব একটা খারাপ লাগছে না।

তবে আরেকজন শিক্ষার্থী বলেন সব কিছুতে সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখলে খারাপ লাগবে। মনে হবে আমি কি অপরাধী ? আমি কি অপরাধ করলাম?

সমাজবিজ্ঞানী মাহবুবা নাসরীন বলছেন সন্তানদের বিষয়ে সচেতন হওয়ার বিকল্প নেই, তবে বাবা মায়ের উচিত হবে সতর্ক ভাবেই সেটি করা।

“কতটুকু পর্যবেক্ষণ করবো, সীমা কতটুকু কিংবা কীভাবে নজরদারি করবো সেটা অভিভাবক বুঝতে পারলে সমস্যা হবে না”।

তার বিশ্বাস চমৎকার পারিবারিক বন্ধন ও যথাযথ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমেই সম্ভব হবে সন্তান নিয়ে সব ধরনের উদ্বেগ থেকে মুক্ত থাকা।

Advertisment ad adsense adlogger