টাঙ্গাইল-৫ আসনের একসময়ের সংসদ সদস্য প্রবীণ রাজনীতিক আবদুল মান্নান ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহচর। তিনি বঙ্গবন্ধু সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং পরে স্বাস্থ্যমন্ত্রীও ছিলেন। মজলুম জননেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর স্নেহভাজন আব্দুর রহমান বিএনপির টিকিটে এ আসনের সংসদ সদস্য হয়ে ধর্মমন্ত্রী হয়েছিলেন। বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) মাহমুদুল হাসান এই আসনে মোট চারবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে দুইবার এবং পরবর্তী সময়ে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে দুইবার নির্বাচিত হন। তিনি জাতীয় পার্টি সরকারের মন্ত্রীও ছিলেন।একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে এ আসনে চমক দেখা যেতে পারে। শোনা যাচ্ছে, মাহমুদুল হাসান আবার জাতীয় পার্টিতে যোগ দেবেন। যদি আওয়ামী লীগের সঙ্গে জাতীয় পার্টির মহাজোট হয় তাহলে তাঁকে এ আসনে মহাজোটের প্রার্থী করা হতে পারে। তখন বিএনপিতে আসতে পারেন তরুণ নেতা যুবদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন টুকু। আর জাতীয় পার্টি একক নির্বাচন করলে দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য সাবেক সংসদ সদস্য আবুল কাশেম দলীয় টিকিট পাবেন। আর মহাজোট থেকে মাহমুদুল হাসান মনোনয়ন না পেলে আবুল কাশেম আবারও মহাজোটের প্রার্থী হতে পারেন।তবে টাঙ্গাইল শহরে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা হচ্ছে যে সাবেক ছাত্রলীগ নেতা মুরাদ সিদ্দিকী আওয়ামী লীগে যোগ দিচ্ছেন। তিনি আওয়ামী লীগে যোগ দিলে মনোনয়নও তিনি পাবেন এবং সে ক্ষেত্রে দলীয় টিকিট হাতছাড়া হবে আওয়ামী লীগদলীয় বর্তমান সংসদ সদস্য ছানোয়ার হোসেনের।জাতীয় সংসদের ১৩৪ নম্বর নির্বাচনী এলাকা টাঙ্গাইল-৫ আসনে বিএনপির কোন্দল দীর্ঘদিন ধরে চলায় সাংগঠনিক ভিত্তি অনেকখানি দুর্বল হয়ে পড়েছে। তরুণ নেতৃত্ব দিয়ে নতুন করে জেলা কমিটি গঠন করা হয়েছে। এখানেও কয়েকজন নেতা জ্যেষ্ঠ হিসেবে প্রত্যাশিত পদ না পেয়ে বিদ্রোহী হয়ে উঠেছেন। তাঁরা বেশির ভাগ সময় মূল দলের বিরুদ্ধে পাল্টাকর্মসূচি দিচ্ছেন। অবশ্য অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতার পরামর্শে তাঁরা দলের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে পেরেছেন। তবে নির্বাচনকে সামনে রেখে এ বিরোধ নিরসন করা হবে বলে জানায় দলের অনেকে জেলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় এলাকা টাঙ্গাইল-৫ আসনের প্রার্থী মনোনয়নের প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলো বিশেষভাবে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন দলের মনোনয়নপ্রত্যাশীরা দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের আস্থা অর্জন করতে এবং অন্য নেতাকর্মীদের সমর্থন পেতে অনেক দিন আগেই মাঠে নেমেছেন। সেই সঙ্গে মনোনয়নের প্রত্যাশায় কেন্দ্রেও দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়েছে অনেকের।মাঠপর্যায়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বড় দুটি রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি থেকে যিনিই মনোনয়ন পান না কেন তাঁকে মুরাদ সিদ্দিকীর সঙ্গে লড়াই করেই বিজয়ী হতে হবে। গত তিনটি নির্বাচনে মুরাদ সিদ্দিকী তুমুল লড়াই করে শেষ পর্যন্ত ‘ম্যাকানিজমের’ কাছে হেরে যান। এবার তিনি আরো শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছেন। দীর্ঘদিন ধরে মাঠ গুছিয়ে গণসংযোগ করছেন। প্রায় প্রতিদিনই শীতের রাতেও বিভিন্ন এলাকায় সভা-সমাবেশ করছেন। সুষ্ঠু ও প্রভাবমুক্ত নির্বাচন হলে এবার মুরাদ সিদ্দিকীকে আর হারানো যাবে না বলে টাঙ্গাইল সদরে সাধারণ মানুষের মধ্যে আলোচনা রয়েছে। তা ছাড়া আওয়ামী লীগের টিকেটে তিনি নির্বাচন করলে বিজয় তাঁর জন্য খুব সহজ হয়ে যাবে।
মুরাদ সিদ্দিকী বলেন, ‘আমি মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান। আমি মনেপ্রাণে আওয়ামী লীগের একজন কর্মী। বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আদর্শ বুকে লালন করি। সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও বিশেষ করে মাদকের বিরুদ্ধে আমার সংগ্রাম। মানুষকে ভালোবাসতে এবং তাদের ভালোবাসা পেতে নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে তাদের সেবা করতে চাই।’ জেলার অন্যান্য স্থানের চেয়ে জাতীয় পার্টি (এরশাদ) এ আসনে অনেক সক্রিয়। আবুল কাশেম দলকে চাঙ্গা রাখতে চেষ্টা করছেন।অন্যদিকে ব্যাপক আলোচনায় এসেছেন ইনডেক্স গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান পীরজাদা শফিউল্লাহ আল মুনির। তিনি আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন চাইতে পারেন। অথবা স্বতন্ত্র প্রার্থীও হতে পারেন। এ ব্যাপারটি এখনো পরিষ্কার নয়। তবে তিনি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যোগ দিচ্ছেন, দান করছেন দুহাত খুলে। তিনি বিশাল বহর নিয়ে চলাচল করেন। অবশ্য এ নিয়ে সমালোচনাও রয়েছে। তাঁর নিরাপত্তাকর্মীরা সশস্ত্র অবস্থায় থাকে। এ জন্য অনেকে মনে করে, তিনি নির্বাচিত হলে তাঁর সঙ্গে সাধারণ মানুষের দেখা করা কঠিন হয়ে যেতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে শফিউল্লাহ আল মুনিরের নির্বাচনে। আওয়ামী লীগ : এ আসনে কোনো নাটকীয়তা না হলে বর্তমান সংসদ সদস্য জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ছানোয়ার হোসেন এবারও মনোনয়ন পেতে পারেন। তিনি গণসংযোগ চালাচ্ছেন। এ ছাড়া কিছুদিন আগে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চাওয়ার কথা বলেছেন টাঙ্গাইলের আওয়ামী লীগ নেতা ও মুক্তিযোদ্ধা প্রয়াত ফারুক আহমেদের স্ত্রী দলের জেলা শাখার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নাহার আহমেদ এবং সাংগঠনিক সম্পাদক ও টাঙ্গাইল পৌরসভার মেয়র জামিলুর রহমান মিরন। টাঙ্গাইল পৌরসভা নির্বাচনে তিনবার বিপুল ভোটে মেয়র নির্বাচিত হন মিরন। বিশাল কর্মীবাহিনী ও সাধারণ মানুষকে কাছে টানার দক্ষতা রয়েছে তাঁর। তিনি দলীয় মনোনয়ন পেলে সাড়া ফেলতে পারবেন বলে দলের বাইরেও আলোচনা রয়েছে।
জামিলুর রহমান মিরন বলেন, “জনগণ কথার নয়, কাজের মানুষ খোঁজে। আমি নেতা হয়ে বসে থাকতে চাই না। কর্মী হয়ে জনগণের ‘কামলার’ মতো কাজ করতে চাই। মেয়র থেকে পরিধি বাড়িয়ে বেশি মানুষের, বেশি এলাকার উন্নয়ন করতে চাই। তাই আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশা করছি।”টাঙ্গাইল সদর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি খোরশেদ আলমও দলের মনোনয়ন চাইতে পারেন।বিএনপি : বিএনপির প্রার্থী হিসেবে দলের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সাবেক মন্ত্রী মেজর জেনারেল (অব.) মাহমুদুল হাসান এবারও মনোনয়ন পেতে পারেন। তবে এ আসনে বিএনপির মনোনয়ন দৌড়ে অনেক এগিয়ে গেছেন যুবদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন টুকু। তিনি প্রত্যন্ত অঞ্চলে নেতাকর্মীদের চাঙ্গা করতে কাজ করে যাচ্ছেন। কেন্দ্রে তাঁর দৃঢ় অবস্থান রয়েছে। বিভিন্ন স্থানে সভা-সমাবেশে অংশ নিচ্ছেন তিনি। তরুণ প্রজন্মের কাছে তিনি জনপ্রিয়।সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, ‘সদরে বড় হয়েছি। বন্ধু-বান্ধব, পরিচিতজন এখানেই। এখানে ইউনিয়নভিত্তিক মানুষের সঙ্গে আমার যোগাযোগ রয়েছে। এখন মানুষ তরুণ নেতৃত্ব দেখতে চায়। এসব বিবেচনায় আশা করছি দলের মনোনয়ন পাব। দলের চেয়ারপারসন ও তারেক রহমানের প্রতি পূর্ণ আস্থা রয়েছে। তাঁরা যে সিদ্ধান্ত দেবেন তা মেনে নিয়ে তাঁদের নির্দেশেই কাজ করব।’বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য খন্দকার আহসান হাবিব, দলের জেলা শাখার জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ছাইদুল হক ছাদু মনোনয়ন পাওয়ার প্রত্যাশা নিয়ে কাজ করছেন। জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ ইকবালের নামও মনোনয়নপ্রত্যাশীদের তালিকায় আছে বলে শোনা যাচ্ছে। তাঁর সঙ্গে নেতাকর্মীদের যোগাযোগ রয়েছে। তবে সুলতান সালাউদ্দিন টুকু মনোনয়ন চাওয়ায় শেষ পর্যন্ত তিনি নিজেকে সরিয়ে নেবেন বলেও জেলার কয়েকজন নেতা জানান।জাতীয় পার্টি : আওয়ামী লীগের সঙ্গে মহাজোট হলে এবং আসনটি জাতীয় পার্টিকে ছেড়ে দিলে আবুল কাশেম মনোনয়ন পেতে পারেন। আর জাতীয় পার্টি এককভাবে নির্বাচনে গেলে আবুল কাশেমের মনোনয়ন প্রায় নিশ্চিত।আবুল কাশেম বলেন, ‘আমার ব্যবসা রয়েছে। রাজনীতি করে অর্থ উপার্জনের কোনো ইচ্ছা আমার নেই। আমি মানুষের ও এলাকার উন্নয়নের জন্য কাজ করতে চাই। আমি সংসদ সদস্য থাকাবস্থায় কোনো অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ কেউ করতে পারবে না।’সংসদের বর্তমান বিরোধী দল জাতীয় পার্টির জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মোজাম্মেল হকও মনোনয়ন প্রত্যাশায় প্রচার চালাচ্ছেন।দলীয় সূত্রে জানা গেছে, আবুল কাশেমের সঙ্গে মোজাম্মেল হকের চরম বিরোধ রয়েছে। সদর উপজেলা জাতীয় পার্টির ইউনিয়ন পর্যায়ের বেশির ভাগ নেতা মোজাম্মেল হকের বিরোধী। তাঁরা দলীয় প্রার্থী হিসেবে আবুল কাশেমকে দেখতে চান। সম্প্রতি টাঙ্গাইল প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলন করে তাঁরা (সদর উপজেলা জাতীয় পার্টির নেতারা) মোজাম্মেল হকের বহিষ্কার দাবি করেছেন। জেলা জাতীয় পার্টির সাবেক সভাপতি আব্দুস সালাম চাকলাদারও দলের মনোনয়নপ্রত্যাশী।অন্যান্য : জাতীয় পার্টির (জেপি) নির্বাহী সম্পাদক সাদেক সিদ্দিকী একাদশ সংসদ নির্বাচনে ১৪ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন আশা করছেন। অন্যদিকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হবেন বলে সৈয়দ খালেদ মোস্তফা দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচনী এলাকার মানুষের দ্বারে দ্বারে যাচ্ছেন।