জুলে রিমে থেকে ফিফা কাপ

২০তম বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে আলোচনা শুরু হয়ে গেছে। অফিসে বসের টেবিল থেকে শুরু করে মহল্লায় চায়ের দোকান সবখানেই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আছে বিশ্বকাপ ফুটবল। আগেই বলেছি, ১৪ জুন শুরু হয়ে এ প্রতিযোগিতা শেষ হবে ১৫ জুলাই। এবারের বিশ্বকাপ আয়োজন করছে রাশিয়া। রাশিয়া ১৯৫৮ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের ব্যানারে প্রথম বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করলেও সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাগ হয়ে যাবার পর রাশিয়া ২০০২ সালে প্রথম এককভাবে বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করে। তবে সোভিয়েত ইউনিয়ন বা রাশিয়া এবারই প্রথম বিশ্বকাপের আয়োজন করছে। এ কথা সবার জানা, ১৯৩০ সালে বিশ্বকাপ ফুটবলের প্রথম আসর বসে উরুগুয়েতে। মন্টিভিডিওতে বিশ্বকাপ ফুটবলের প্রথম ফাইনাল ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। মন্টিভিডিও থেকে মস্কো। বিশ্বকাপ ফুটবলের ৮৮ বছরের পথচলা নিয়ে আমাদের ধারাবাহিক আয়োজন ‘বিশ্বকাপকথন’। লিখেছেন… প্রথিতযশা কবি, কথাসাহিত্যিক ও ক্রীড়ালেখক সৈয়দ মাজহারুল পারভেজ বিশ্বকাপের আয়োজক ফিফা। ১৯০৪ সালের ২১ মে ঋবফবৎধঃরড়হ ওহঃবৎহধঃরড়হধষ উব ঋড়ড়ঃনধষষ অংংড়পরধঃরড়হ (ঋওঋঅ) গঠিত হয়। তবে গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয় ১৮৬৩ সালে। সেটার বাস্তবায়ন হতে সময় লেগে যায় দীর্ঘ ৪১ বছর। ফ্রান্স ফুটবল ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক মি. ডেলেউনির নেতৃত্বে প্যারিসে ইউরোপের ৭টি দেশের এক বৈঠকে ফিফা গঠিত হয়। সেদিনের সে বৈঠকে উপস্থিত ছিল ফ্রান্স, বেলজিয়াম, সুইডেন, নেদারল্যান্ড, ডেনমার্ক, পর্তুগাল ও স্পেনের ফুটবলকর্তারা। এরাই ফিফার প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। ফ্রান্সের রবার্ট গুয়েবিনকে ফিফার প্রথম সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। ফুটবলের পিতা ইংল্যান্ড সে বৈঠকে যোগ দেয়নি। হতে পারে সে সময় তারা ফিফার গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারেনি। সেটা উপলব্ধি করতে ইংরেজ সাহেবদের দু’বছর কেটে যায়। ইংল্যান্ডের স্যার উডফুল ১৯০৬ সালে ফিফার সভাপতি নির্বাচিত হলে ইংল্যান্ড সদস্যপদ গ্রহণ করে। উডফুল ছিলেন ফিফার প্রথম সফল সভাপতি। তার নেতৃত্বে ফিফার কার্যক্রম গতিশীল হয়। সদস্য সংখ্যাও বাড়তে থাকে। বর্তমানে সে সদস্য সংখ্যা উন্নীত হয়েছে ২১১-তে। যা কিনা জাতিসংঘের সদস্যের চেয়েও বেশি। ১৯০৪ সালে ফিফা গঠনের পর ওই সময়েই সিদ্ধান্ত হয় ফিফা ‘বিশ্বকাপ ফুটবল’ আয়োজন করবে। অনেকে মনে করেন মঁশিয় জুলে রিমে, যার নামে বিশ্বকাপ ফুটবলের নামকরণ দীর্ঘ ৪০টি বছর বহাল ছিল তিনিই বুঝি বিশ্বকাপ ফুটবলের প্রস্তাবক। বাস্তবে সেটা নয়। বিশ্বকাপ ফুটবল আয়োজনের বিষয়টি প্রথম মাথায় আসে সেই মি. ডেলেউনির। তিনিই বিশ্বকাপ ফুটবলের প্রথম স্বপ্নদ্রষ্টা ও প্রস্তাবক। যদিও বিশ্বকাপ ফুটবলের প্রথম আসর দেখে যাওয়ার সুযোগ তিনি পাননি। ১৯০৬ সালে বিশ্বকাপ ফুটবলের প্রথম আসর বসলে তিনি দেখে যেতে পারতেন। তবে ১৯০৬ সালে বিশ্বকাপের প্রথম আসর অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত হলেও সে বছর বিশ্বকাপ আয়োজন করতে পারেনি ফিফা। প্রথম দিকে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার কারণে ও পরে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের জন্যে পেছাতে পেছাতে শেষ পর্যন্ত তা ১৯৩০ সালে গিয়ে ঠেকে। তার আগেই মি. ডেলেউনি ইহলোক ত্যাগ করেন। ফলে তাঁর আর বিশ্বকাপ দেখার স্বপ্নপুরণ হ’ল না। ১৯৩০ সালে বিশ্বকাপ ফুটবলের প্রথম আসর বসে। আয়োজকের দৌঁড়ে ফ্রান্সসহ ইউরোপের অনেক দেশ ছিল। কিন্তু সবাইকে টেক্কা দিয়ে সুদূর পশ্চিমা দেশ উরুগুয়ে বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব পায়। কেন পায় কীভাবে পায় সে আলোচনায় পরে আসছি। মি. ডেলেউনির মৃত্যুর পর তাঁর স্বপ্ন বাস্তবায়নের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন ফ্রান্স ফিফা ও ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি মঁশিয় জুলেরিমে। তিনি বিশ্বকাপ ফুটবল আয়োজনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। ফলে বিশ্বকাপের নামকরণও হয় তাঁরই নামে। ‘জুলেরিমে ট্রফি’। জুলেরিমে ট্রফিটির ব্যয়ভারও বহন করেন তিনি। এ ট্রফি তৈরির দায়িত্ব দেয়া হয় প্যারিসের খ্যাতিমান অলংকার নির্মাতা আবেল লফরিউরকে। জুলেরিমে ট্রফি দেখতে ছিল অনেকটা ‘সোনার পরী’র মতো। এটি ছিল ডানাযুক্ত ‘নাইক’ আকৃতির। গ্রিক পুরাণের ভাষায় নাইক হচ্ছে সাফল্যের দেবী। তারই আদলে জুলেরিমে ট্রফি তৈরি করা হয়। জুলে রিমে ট্রফির ওজন ছিল ১১ পাউন্ড। ১.৮ কেজি সোনায় মোড়ানো এ ট্রফির উচ্চতা ছিল ৩০ সে.মি. এবং প্রস্থে ৩৬ সে.মি. যথারীতি বিশ্বকাপের আসর বসে উরুগুয়েতে। বিশ্বকাপ ফুটবলের প্রথম ট্রফিও ঘরে তোলে স্বাগতিক উরুগুয়ে। ১৯৩৪ সালে দ্বিতীয় আসরেও শিরোপা ধরে রাখে স্বাগতিকরা। তবে উরুগুয়ে নয়, এবার ইউরোপের দেশ ইতালি ট্রফি ঘরে তোলে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে ১৯৪২ ও ’৪৬ সালে বিশ্বকাপের কোন আসর বসেনি। ১৯৫০ সালে বিশ্বকাপ ফুটবলের চতুর্থ আসরের আয়োজনের দায়িত্ব পায় ‘ফুটবলের তীর্থস্থান’ খ্যাত ব্রাজিল। দু:খজনক হলেও সত্যি, আয়োজক হয়েও ব্রাজিল কাপ জয় করতে পারেনি। তবে এই না পারাটা ব্রাজিলের জন্যে শাপে-বর হয়ে যায়। তারা ১৯৫৮, ৬২ ও ৭০ সালে তিনবার বিশ্বকাপ জিতে জুলে রিমে ট্রফি চিরকালের জন্যে নিয়ে যায়। মজার ব্যাপার হচ্ছে, ’৫৮ ও ’৬২ সালে ব্রাজিল কাপ জেতার পর ’৬৬ সালে জুলে রিমে ট্রফি রহস্যজনকভাবে চুরি হয়ে যায়। সেবার আয়োজক ছিল ‘ফাদার অব ফুটবল’ ইংল্যান্ড। অনেক খোঁজাখুঁজির পর নরউডের এক বাগানবাড়ি থেকে ‘পিকলস’ নামের এক প্রশিক্ষিত কুকুর সেই হারানো ট্রফি খুঁজে বের করে সংবাদ শিরোণাম হয়। জুলেরিমে ট্রফি আয়োজনের সময় ঘোষণা দেয়া হয়েছিল, যে দল তিনবার বিশ্বকাপ জিততে পারবে ‘কাপ’ চিরকালের জন্যে তাদের হয়ে যাবে। ব্রাজিল কাপ নেয়ার পর যদিও এই ধারা বাতিল করা হয়। ফলে এখন তিনবার কেন তিরিশবার জিতলেও কোন দল কাপ চিরতরে নিতে পারবে না।
ব্রাজিল কাপ নিয়ে যাওয়ায় একটি নতুন বিশ্বকাপ তৈরির প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। ১৯৭৪ সালের বিশ্বকাপকে সামনে রেখে ১৯৭১ সালে ফিফা একটি নতুন বিশ্বকাপ তৈরির উদ্যোগ নেয়। নতুন বিশ্বকাপের নকশার ডিজাইন চেয়ে বিজ্ঞাপন দেয় ফিফা। এতে ব্যাপক সাড়া মেলে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে শীর্ষ শিল্পীরা ডিজাইন পাঠায়। পৃথিবীর শীর্ষ শিল্পীদের ৫৩টি ডিজাইন বাছাই করে তার মধ্যে থেকে ইতালির ডিজাইনার সিলভিও গজ্জালির নকশা মনোনীত করে ফিফা। আর সে নকশার বাস্তবায়ন করেন অলংকারবিদ বার্তৈনি। তবে এবার আর বিশ্বকাপ ট্রফির নামকরণ কোন ব্যক্তির নামে হ’ল না। এবার নামকরণ হ’ল বিশ্বকাপকর্তা খোদ ফিফার নামের সাথে সংগতি রেখে ‘ফিফা কাপ’। ফিফা কাপের ডিজাইন হ’ল এ রকম, একজন এ্যাথলেট’র হাতে ধরা গ্লোব বা পৃথিবী। এবার ফিফা কাপের ওজন হ’ল ৫ কেজি আর উচ্চতা ৩৬ সে.মি. পুরো ১৮ ক্যারেট সোনায় মোড়ানো ফিফা কাপ তৈরির খরচ পড়ে সে সময়েই ২০ হাজার মার্কিন ডলার। ১৯৭৪ সালে ফিফা কাপের প্রথম আসর বসে প. জার্মানিতে। জুলেরিমে ট্রফির মতো ফিফা কাপের প্রথম ট্রফি ঘরে তোলে স্বাগতিক প. জার্মানি। তবে এবার নিয়ম করা হয়, যে দল যতবারই কাপ জিতুক মূল কাপ পাবে না। রেপ্লিকা দেয়া হবে। এখন পর্যন্ত ফিফা কাপেই বিশ্বকাপ ফুটবলের আয়োজন হচ্ছে। ২০১৪ সালে বিশ্বকাপের শেষ আসর বসে ব্রাজিলে। এটা ছিল ব্রাজিলের দ্বিতীয় আয়োজন। এর আগে ১৯৫০ সালে াবশ্বকাপের তৃতীয় আসরের আয়োজক ছিল ব্রাজিল। তবে দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, বিশ্বের সবগুলো মহাদেশে কাপ জয় করলেও দুই বার আয়োজন করেও নিজ দেশে একবারও কাপ জিততে পারেনি ব্রাজিল।

2018-01-17T10:33:40+00:00January 17th, 2018|খেলাধুলা|
Advertisment ad adsense adlogger