সাগরিকায় বাংলাদেশের অকেজো স্পিন আক্রমণ

টেস্ট সিরিজ শুরুর আগেই শোরগোল পড়ে গিয়েছিল বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট স্কোয়াড দেখে। কারণ ১৬ জনের দলে ৬ জন জেনুইন স্পিনার! এমনটা হয়তো আর কখনও কোন টেস্ট স্কোয়াডে ক্রিকেট ইতিহাসেই দেখা যায়নি। শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে অভিজ্ঞ ও বয়সী বাঁহাতি স্পিনার আব্দুর রাজ্জাক এবং একেবারেই আনকোরা মুখ, দলের সর্বকনিষ্ঠ ক্রিকেটার ডানহাতি অফস্পিনার নাঈম হাসানকে বাদ রেখেই একাদশ সাজানো হয়। এরপরও চট্টগ্রাম টেস্টের একাদশে জেনুইন স্পিনার তিনজনÑ তাইজুল ইসলাম, মেহেদী হাসান মিরাজ ও সানজামুল ইসলাম। সবচেয়ে বেশি ওভার, সবচেয়ে ভাল বোলিং করলেন তাইজুলÑ সেজন্য পুরস্কার হিসেবে জুটেছে মাত্র এক উইকেট। একটি উইকেট নিতে পেরেছেন মিরাজ, বিপরীতে হয়েছেন তুলোধুনো। আর অভিষেক হওয়া সানজামুল পুরো দিন বোলিং করেও শ্রীলঙ্কান ব্যাটসম্যানদের ওপর বিন্দুমাত্র আঁচড় কাটতে পারেননি। স্পিন আধিক্যে একাদশ গড়তে গিয়ে একাদশে একজন পেসার নিতে হয়েছে। কিন্তু স্পিনাররা নখ-দন্তহীন, ভোঁতা ও নিষ্কাম হিসেবে প্রমাণিত হয়েছেন ইতোমধ্যে। সানজামুল তো লজ্জার এক রেকর্ডের পথেই রয়েছেন। এমন সুস্বাদু স্পিনের স্বাদ হয়তো এর আগে লঙ্কান ব্যাটসম্যানরা পাননি। দারুণ উপভোগ করেছেন তারা চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে বাংলাদেশের স্পিন আক্রমণকে। ব্যাটটাকে যেন চামচ হিসেবে ব্যবহার করে প্রতিটি স্পিন বোলারের বলগুলোকে উপাদেয় খাবারের মতো চিবিয়েছেন মহা আনন্দে। তৃতীয়দিনে আরও ৩১৫ রান যোগ করতে মাত্র দুটি উইকেট হারিয়েছে লঙ্কানরা কিন্তু সেটাকে প্রাপ্তির খাতায় যোগ করার মতো কোন সাফল্য হিসেবে গণ্য করা যায় না। অথচ এই স্পিন আক্রমণ সাজাতে গিয়ে অনেক ধরনের কৌশল গ্রহণ করে বাংলাদেশ দল। প্রতিপক্ষের সঙ্গে খেলায় নামার আগেই মনস্তাত্ত্বিক খেলা খেলতে গিয়ে ৬ জেনুইন স্পিনারকে দলে ভেড়ায়। প্রথমবারের মতো ডাক পান ২৮ বছর বয়সী সানজামুল, তানবীর হায়দার ও ১৭ বছর বয়সী নাঈম। সঙ্গে ৪ বছর পর জাতীয় দলে ফিরে আসা ৩৫ বছর বয়সী রাজ্জাকের সঙ্গে ছিলেন মিরাজ ও তাইজুল। সাগরিকার উইকেট বরাবরই স্পিনবান্ধব। সে কারণেই একাদশে শেষ পর্যন্ত একমাত্র পেসার হিসেবে নেয়া হয় মুস্তাফিজুর রহমানকে। আর মিরাজ, তাইজুল ও সানজামুলকে নিয়ে সাজানো হয় স্পিন আক্রমণ। দেশের পক্ষে ৮৭তম টেস্ট ক্রিকেটার হিসেবে যাত্রা শুরু করেছেন এ ম্যাচে সানজামুল। তিনি শুরু থেকে ভাল লাইন-লেন্থে বল করে গেলেও কোন সাফল্য পাননি। এখন পর্যন্ত উইকেটশূন্যই আছেন এ বাঁহাতি স্পিনার। তৃতীয়দিন শেষে শ্রীলঙ্কা ৩ উইকেটে ৫০৪ রান করেছে। এর মধ্যে সানজামুল রান দিয়েছেন ১৩৮, বোলিং করেছেন ৩৭ ওভার। দুটি মাত্র মেডেন নিতে পেরেছেন। এরপরও ইকোনমি রেটে তাইজুলের পর তারই অবস্থা ভাল। অভিষেক টেস্টে ১০০ রান দিয়ে উইকেটশূন্য থাকার ঘটনা আছে ২৬ বোলারের। তারা কেউ বেশিদিন টেস্ট ক্রিকেটে টিকে থাকতে পারেননি। সিংহভাগেরই ক্যারিয়ার শেষ হয়ে গেছে এক-দুই টেস্ট খেলে। এর মধ্যে ১০০ টেস্ট উইকেটের বেশি নিতে পেরেছিলেন মাত্র একজন। কেবল পেসার জেফ থমসন ক্যারিয়ারের শুরুতে যে ধাক্কা খেয়েছিলেন তা সামলে ৫১ টেস্টে ২০০ উইকেট নিয়ে ইতি টানতে পেরেছিলেন। এরপর কমপক্ষে ৫০ উইকেট নিতে পেরেছেন মাত্র ৫ জন, যাদের মধ্যে বাংলাদেশের শাহাদাত হোসেন রাজিব আছেন। আছেন ভারতের বাপু নাদকার্নি, পাকিস্তানের আকিব জাভেদ। তবে বাংলাদেশের পক্ষে অভিষেকে ১০০ রান না দিয়েও উইকেটশূন্য থাকা বোলারদের মধ্যে বাকি তিনজনÑ আবুল হাসান রাজু, রবিউল ইসলাম ও ফাহিম মুনতাসিরের ক্যারিয়ার আর এগোয়নি জাতীয় দলের হয়ে। অভিষেকে সর্বাধিক ১৬৩ রান দিয়ে উইকেটশূন্য থাকার বিশ্বরেকর্ড আছে ইংল্যান্ডের লেগস্পিনার আদিল রশিদের। ২০১৫ দুবাই টেস্টে পাকিস্তানের বিপক্ষে ১৬৩ রান দিয়ে উইকেটশূন্য থাকার ভয়াবহ অভিজ্ঞতা হয়েছিল আদিল রশিদের। সেই রেকর্ড ভাঙ্গার পথে সানজামুলের প্রয়োজন আর মাত্র ২৬ রান দেয়ার। সাগরিকায় এখন ফিরে ফিরেই আসছে রাজ্জাকের নাম। দীর্ঘ ৪ বছর পর তাকে দলে ডেকেও শেষ পর্যন্ত না খেলানোর আফসোসটা সঙ্গী হচ্ছে তাইজুলের বোলিং দেখার পর। শুধু এই বাঁহাতিই যা একটু লঙ্কান ব্যাটসম্যানদের রানোৎসবে বাগড়া দিতে পেরেছেন। এ জন্যই সর্বাধিক ৫১ ওভার বোলিং করেছেন তিনি। ১৩ মেডেন যেমন আদায় করেছেন তেমনি জন্মদিনে ক্যারিয়ারসেরা ১৯৬ রান করা কুশল মেন্ডিসকে সাজঘরে ফিরিয়েছেন। ২.৮২ ইকোনমিতে ১৪৪ রান দেয়া তাইজুলই সবচেয়ে মিতব্যয়ী বোলার। রাজ্জাক থাকলে হয়তো ভাল জুটিই হতে পারতো। কিন্তু এর পরিবর্তে সানজামুলের স্পিন নিষ্কাম, নিষ্ফলা আর অকেজো বলেই প্রমাণিত হয়েছে। তার ভোঁতা স্পিন লঙ্কান ব্যাটসম্যানদের নিবিড় মনোসংযোগে কোন প্রকার আঁচড়ই কাটতে পারেনি। দ্বিতীয়দিন লঙ্কানরা ব্যাটিংয়ে নামার পরই মিরাজ ম্যাজিক দেখিয়েছিলেন ওপেনার দিমুথ করুনারত কে শূন্য রানে সাজঘরে ফিরিয়ে। এরপর সেই মিরাজকে ইচ্ছে মতো পিটিয়েছেন লঙ্কান ব্যাটসম্যানরা। সবচেয়ে বেশি মিরাজের অফস্পিন বোলিংকেই উপভোগ করেছেন তারা। মাত্র ১৯ ওভার বোলিং করে ৯৭ রান খরচা করা মিরাজ কোন মেডেন আদায় করতে পারেননি। এতেই প্রমাণ হয় তার স্পিন কতটা নিষ্ফলা।

 

 

 

2018-02-03T07:23:31+00:00February 3rd, 2018|খেলাধুলা|
Advertisment ad adsense adlogger