প্রথম ইনিংসে ৫১৩ রানের বড় সংগ্রহ আর দ্বিতীয় ইনিংসে চতুর্থদিন শেষে ৩ উইকেটে ৮১। সাগরিকা টেস্টে বাংলাদেশের সবমিলিয়ে সংগ্রহ ৫৯৪। এরপরও শ্রীলঙ্কার কাছে পরাজয়ের জোর শঙ্কা উঁকি দিচ্ছিল। কারণ দুটি, যার একটা তখনও ১১৯ রানে পিছিয়ে বাংলাদেশ এবং সময়- পুরো ১ দিন বাকি টেস্টের। এমন পরিস্থিতিতে পেছনে আছে অনেক ব্যর্থতার ইতিহাস যার সর্বশেষটি গত বছর নিউজিল্যান্ড সফরেই ছিল। তখন কোচ চান্দিকা হাতুরাসিংহের অধীনে ৫৬ রানের লিড নিয়েও শেষ পর্যন্ত ৭ উইকেটে হেরে গিয়ে বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছিল বাংলাদেশ। কিন্তু এবার নিজেদের ইতিহাসই পাল্টে ফেললো টাইগাররা। চান্দিকা প্রতিপক্ষ শ্রীলঙ্কার কোচ, আর বাংলাদেশের কোন কোচই নেই। পরাজয়ের লাল চোখ উপেক্ষা করে সাগরিকায় পঞ্চমদিনে অবিস্মরণীয় ব্যাটিং উপহার দিয়ে বীরোচিত ড্র করেছে স্বাগতিক দল। এর পেছনে প্রথম বাংলাদেশী হিসেবে মুমিনুল হকের টানা দুই ইনিংসে সেঞ্চুরি ও লিটন কুমার দাসের ৯৪ রানের ইনিংস বড় ভূমিকা রেখেছে। ৫ উইকেটে ৩০৭ রান তোলার পর ম্যাচের ১৭ ওভার বাকি থাকতেই উভয় দল ড্র মেনে নিয়েছে। আর সৌভাগ্যবসত অধিনায়কত্ব পাওয়া মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ তার প্রথম নেতৃত্বেই এমন একটি ড্রয়ের স্বাদ পেয়ে শুভ সূচনা করেছেন। সাগরিকায় শেষ দু’দিন স্পিনের ভেল্কিতে অনেকবারই টেস্টের ভাগ্য ঘুরে গেছে বিস্ময়করভাবে। এবারও পিচ রিপোর্টে তেমনই বলা হয়েছিল যে শেষ দু’দিন অন্তত কেউ খেলতে পারবে না, খেলবে স্পিন। শ্রীলঙ্কার প্রথম ইনিংস ৯ উইকেটে ৭১৩ রানে ঘোষিত হওয়ার আগেই সেটার দৃষ্টান্ত দেখা যাচ্ছিল। ২০০ রানে পিছিয়ে থেকে দ্বিতীয় ইনিংসে চতুর্থদিন শেষে বাংলাদেশ ৮১ রান তুলতেই ৩ উইকেট হারিয়ে ফেলেছিল। ১১৯ রানে পিছিয়ে থাকা পুরো একটা দিন বাকি থাকার পর ক্রিকেট বিশ্লেষকরাও স্বাগতিক বাংলাদেশের পরাজয়ই দেখতে পাচ্ছিলেন। কারণ ড্র করতে হলেও বাকি থাকা ৭ উইকেট নিয়ে অন্তত চা বিরতির পর পর্যন্ত ব্যাট চালাতে হবে। এমন চাপের মুখে থেকে সেই ব্যাটিং করাটা যে কোন দলের জন্যই চাপের। কিন্তু তখনও উইকেটে মুমিনুল ছিলেন বলে কেউ কেউ অনেক বড় স্বপ্ন দেখছিলেন। ড্রয়ের তো অবশ্যই আবার আকাশ কুসুম কল্পনায় জয়ের উচ্চাভিলাষও ছিল। ১৮ রান নিয়ে খেলতে নেমে মুমিনুল পঞ্চমদিনের শুরুতে নতুন সঙ্গী হিসেবে পেয়েছিলেন উইকেটরক্ষক ব্যাটসম্যান লিটনকে। আগেরদিন মুশফিকুর রহীম আউট হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই খেলা শেষ হয়ে গিয়েছিল। মুমিনুল-লিটনের ব্যাট যেন অনেক চওড়া হয়ে গেল। স্পিনত্রয়ী রঙ্গনা হেরাথ, দিলরুয়ান পেরেরা আর লক্ষণ সান্দাকানের ঘূর্ণি বলও তাতে কোন ফাটল তৈরি করতে পারেনি। যে কোন টেস্টের পঞ্চমদিনের প্রথম সেশনটা বেশ ভয়ানক। যত বিভীষিকাময় কা–কীর্তির সূচনা হয় এই সেশনেই। ভয়টা ছিল বাংলাদেশ দলকে নিয়েও। কারণ অনেকবারই বাংলাদেশ দল এমন পরিস্থিতিতে দুমড়ে-মুচড়ে গেছে। ব্যতিক্রম ছিল ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় স্টেডিয়ামে হওয়া শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে টেস্ট ম্যাচটি। সেই ম্যাচ ৬ দিনব্যাপী হয়েছিল, জাতীয় নির্বাচনের জন্য ২৯ ডিসেম্বর দেয়া হয়েছিল বিরতি। ৫২০ রানের জয়ের লক্ষ্যে খেলতে নেমে ২৯২ রানে ৬ উইকেট হারিয়ে নিশ্চিত পরাজয় দেখছিল বাংলাদেশ। কিন্তু সপ্তম উইকেটে মুশফিক-সাকিব আল হাসানের বীরত্বপূর্ণ ১১১ রানের জুটি অসম্ভব জয়ের স্বপ্ন দেখাচ্ছিল। সাকিব ৯৬ রানে সাজঘরে ফিরলে শেষ পর্যন্ত ১০৭ রানে হেরে যায় বাংলাদেশ দল। আর গত বছর জানুয়ারিতে নিউজিল্যান্ড সফরে ৮ উইকেটে ৫৯৫ রানে প্রথম ইনিংস ঘোষণা করে কিউইদের ৫৩৯ রানে থামিয়ে দিয়েছিল বাংলাদেশ। ৫৬ রানে এগিয়ে থেকে চতুর্থদিনের শেষেই সব বিপক্ষে যেতে শুরু করে। ৩ উইকেটে চতুর্থদিন শেষে ৬৬ রান তুলে উল্টো পরাজয়ের যে শঙ্কা দেখছিল দল, সেটাই সত্য হয়ে যায়। ১৬০ রানে বাংলাদেশের দ্বিতীয় ইনিংস গুটিয়ে যায়। ২১৭ রানের জয়ের লক্ষ্যটা মাত্র ৩ উইকেট হারিয়ে ছুঁয়ে জয় তুলে নেয় কিউইরা। কোচ চান্দিকার অধীনেই ওয়েলিংটনে হওয়া সেই ম্যাচটি হারে সফরকারীরা। এ কারণেই এবার পরাজয়ের শঙ্কাই উঁকিঝুঁকি মারছিল। সেটাকে সত্য হতে দেননি মুমিনুল। তার যুদ্ধটা ছিল চান্দিকার বঞ্চনার বিপক্ষেও, বাংলাদেশ দলের চ্যালেঞ্জ ছিল চান্দিকার অধীনে লঙ্কান শিবিরকে হতোদ্যম করে দেয়ার। পঞ্চমদিনের প্রথম সেশনে মুমিনুল-লিটন তুলে ফেলেন ১০৬ রান। তাদের বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি চান্দিকার শিষ্য বোলাররা। কিন্তু বিপদটা কাটেনি তখনও, কারণ ১৩ রান পিছিয়ে বাংলাদেশ। আরেকটি ভাল সেশন কাটানোর কঠিন পরীক্ষা। সেই পরীক্ষাতেও বেশ ভালভাবেই এগিয়ে যায় মুমিনুল-লিটন। তাদের ১৮০ রানের চতুর্থ উইকেট জুটি যখন ভাঙ্গে তখন ৬১ রানে এগিয়ে গেছে বাংলাদেশ। চতুর্থ উইকেটে বাংলাদেশের পক্ষে টেস্টে এটিই রেকর্ড রানের জুটি। এর আগে চতুর্থ উইকেটে ২০১২ সালে নাঈম ইসলাম-সাকিব ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ১৬৭ রান করেছিলেন ঢাকায়। এর মধ্যেই রেকর্ড গড়েন মুমিনুল প্রথম বাংলাদেশী হিসেবে টেস্টের দুই ইনিংসেই সেঞ্চুরি হাঁকানোর রেকর্ড গড়েন। তবে এরপর বেশিক্ষণ থাকতে পারেননি। ১৭৪ বলে মাত্র ৫ চার ও ২ ছক্কায় ১০৫ রান করার পর ধনঞ্জয়ার বলে সাজঘরে ফেরেন। দুই ইনিংসে ২৮১ রান করেও একটি রেকর্ড গড়েন তিনি। এর আগে এক টেস্টের দুই ইনিংস মিলিয়ে সর্বাধিক ২৩১ রান ছিল তামিম ইকবালের। এরপরও সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে দেখা দিয়েছিল সময়। তখনও চা বিরতি হয়নি, খুব বেশি লিডও নেয়া যায়নি। চা বিরতির সামান্য আগেই সাজঘরে ফেরেন লিটনও, ক্যারিয়ারের প্রথম সেঞ্চুরি থেকে মাত্র ৬ রান দূরে থাকতে। ১৮২ বলে ১১ চারে তিনি ৯৪ রান করেন, এরপর হেরাথকে ছক্কা হাঁকাতে গিয়ে পেরেরার হাতে ধরা পড়েন তিনি। বিপদ নতুন করে দেখা দেয়। কিন্তু চা বিরতির পর অধিনায়ক মাহমুদুল্লাহর সঙ্গে উইকেটে শামুকের মতো পড়ে থাকেন মোসাদ্দেক। ৫৩টি বল খেলে তিনি ৮ রান করেন মাত্র ১ চারে। সময় কাটিয়ে দেয়ার প্রয়োজন ছিল, সেটাই করেছেন তিনি। আর মাহমুদুল্লাহ সাবলীলভাবে খেলেই ৬৫ বলে ২৮ রান করে অপরাজিত থাকেন। ৫ উইকেটে ৩০৭ রান তুলে ফেলে বাংলাদেশ, এগিয়ে যায় ১০৭ রানে। ওই সময় লঙ্কান অধিনায়ক দিনেশ চান্দিমাল ড্র মেনে নিয়ে মাহমুদুল্লাহর সঙ্গে করমর্দন করেন। ড্র মেনে নিতে বাধ্য হয় শ্রীলঙ্কা। আর বীরোচিত ড্রয়ে জয়ের আনন্দেই মাঠ ছাড়ে বাংলাদেশ দল।